মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে একটা। যশোর শহরের ৫ নং ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্র সরকারি (মাইকেল মধুসূদন) এম এম কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির প্রবেশমুখে নেই কোনও নিরাপত্তারক্ষী। চোখে পড়ল না নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে ন্যস্ত কোনও সরকারি বাহিনীর সদস্যদেরও। কলেজের প্রবেশ গেট দিয়ে ঢুকতে পাওয়া গেল না নিজস্ব কোনও রক্ষীকেও। পিনপতন নীরবতা। এমনই এক দৃশ্য এম এম কলেজের। হঠাৎ করেই কলেজের তৃতীয় তলার তিনটি রুমের জানালা দিয়ে উৎসুক কয়েকজনের উঁকি। এক হাতে মোবাইল, অন্য হাতে সিগারেটের ছোট্ট আলোকরশ্মিও দেখা গেল। এরই মধ্যে তাদের আনাগোনাও বেড়ে গেল। ভেতরে কয়েকজনের ব্যস্ততা বাড়ে, বাইরে কয়েকজনের সতর্ক পাহারা।
এরই মধ্যে যশোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শিকদার আক্কাছ আলীকে এ তথ্য জানানো হলে, ‘অনেকটাই উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, এত রাতে কে বলেছে আপনাদের কেন্দ্র দেখতে? আমাদের টহল বাহিনীর সদস্যরা আছেন। তারা দেখবেন।’ প্রসঙ্গত, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকেও সাংবাদিকদের কেন্দ্র পর্যবেক্ষণের বিষয়টি জানানো হয়েছিল। যদিও ওই সময় আক্কাছ আলীর মন্তব্য ছিল, ‘বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন। রিটার্নিং অফিসার চাইলে আমরা সব কিছু করতে পারি।’
প্রায় ১০ মিনিট এম এম কলেজে মধ্যরাতে কতিপয় ব্যক্তির আনাগোনা পর্যবেক্ষণ করতে-করতে মেইন গেটের দিকে বেরিয়ে আসে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের দুটি গাড়ি। মিনিট দুয়েক মেইন গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেই হঠাৎ গাড়ির পেছন থেকে ৪০-৪৫ জনের একটি দল আসে। প্রত্যেকের মাথায় হুডি। এরপরই নিরাপত্তাহীনতা দেখে সাংবাদিকদের দায়িত্বরত গাড়িটি দ্রুত এম এম কলেজের প্রাঙ্গণ ছাড়ে।
বিষয়টি নিয়ে দুই প্রতিবেদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আর মাত্র এক মিনিট দেরি হলেই ছেলেগুলো হামলে পড়ত আমাদের ওপর।
আরেক সাংবাদিক রানা হানিফ বলেন, যশোর সদর থানার ওসির ব্যবহার অনেকটাই হতাশ করেছে আমাদের। নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। কিন্তু তার কাছে নিরাপত্তা চাইলেও উল্টো তিনি মধ্যরাতে পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিএনপির প্রার্থী মারুফুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএম কামরুজ্জামান চুন্নু দুজনেই অভিযোগ করেছিলেন, ‘যশোরের বিভিন্ন মেস ও বোর্ডিয়ে অনেক বহিরাগত এসেছেন।’
এই দুই প্রার্থীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও পুলিশের এসপি আনিসুর রহমানকে মোবাইলে পাওয়া যায়নি। তবে, যশোর সদর থানার ওসি শিকদার আক্কাছ আলী বাংলা ট্রিবিউনের কাছে দাবি করেন, ‘তারা কোনও অভিযোগ করেননি।’
মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টা। মনিহার সিনেমা হলের সামনের দিকে কয়েকজন চা দোকানদার ও ভ্যান চালক জানান, ‘রাত ১ টা ২০-এর দিকে শতাধিক লোক লাঠিসোটা নিয়ে ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৪ নম্বর কেন্দ্র সিটি কলেজের দিকে গেছেন।’
রাত পৌনে দুটার দিকে বিএনপির প্রার্থী মারুফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, রিটার্নিং অফিসারের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা দিয়ে দরখাস্ত দিয়েও কোনও লাভ হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনও সহযোগিতাই মেলেনি।’
মারুফ জানান, তিনি অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ১৬ টি কেন্দ্রের নাম দিলেও একটিতেও কোনও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কমিশন।’
এ নিয়ে রিটার্নিং অফিসার সাবিনা ইয়াসমিনকে মঙ্গলবার রাতে কয়েকবার চেষ্টা করেও তার জিপি সেলফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান চুন্নু অভিযোগ করেন, ‘২৮ ডিসেম্বর অতিঝুঁকি পূর্ণ হিসেবে ৮ টি কেন্দ্রের নাম দিলেও ভোটের আগের রাতেও দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি দেখিনি।’
এদিকে, সরেজমিনে রাত ১১ টা থেকে যশোর শহরের বারান্দিপাড়া, এম এম কলেজ এলাকা, মনিহার সিনেমা হল এলাকা, খয়েরতলা এলাকা, খালধার রোড, জেল রোড, পুলিশ লাইন এলাকা, রায়পাড়া, পানির ট্যাংকি, ষষ্ঠীতলাসহ নানা এলাকা ঘুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনও টহল দেখা যায়নি।
এ নিয়ে কথা হয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী রেন্টু চাকলাদারের নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকারী ছাত্রলীগের এক তরুণ নেতার সঙ্গে। মঙ্গলবার রাত পৌনে বারেটার দিকে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার নির্দেশনা আছে। সকাল না হওয়া পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না।’
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করার জন্য রেন্টু চাকলাদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
/এমএনএইচ/








