প্রথম বিজয়ের মাসে পত্রিকায় বাংলাদেশ

উদিসা ইসলাম
৩১ ডিসেম্বর ২০১৫, ০১:২৪আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৩:০৩

১. ১৯৭২ এর পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকাশিত হতো পত্র-পত্রিকা এবং ছোট ছোট হ্যান্ডবিল, বুলেটিন। শুধু অবরুদ্ধ বাংলাদেশ, মুক্তাঞ্চল ও মুজিবনগর থেকে  ৬৪টি পত্রিকার সন্ধান পাওয়া যায়। যেগুলোর বেশিরভাগই ছিল  হাতে লেখা। যেগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন এগিয়ে নেওয়া। তারপর স্বাধীন বাংলাদেশে পত্রিকার ধরন পাল্টে যায়। জানুয়ারির প্রথম তারিখ থেকে পত্রিকার পাতায় উঠে আসতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের নানা তথ্য, বর্বরতার চিত্র । আর এগুলোকেই বিচারের সময় প্রসিকিউশন ডকুমেন্টারি এভিডেন্স হিসেবে ব্যবহার করে।
১৯৭২ সালের পত্রিকার পাতা বিশ্লেষণ করে ইতিহাসবিদরা বলছেন, তখন একদিকে চলছে যারা ফিরে আসেনি তাদের খবর প্রকাশ, আরেকদিকে দেশ গড়তে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে সেই সংবাদ। তারা বলেন, সেসময়ের সংবাদপত্রগুলো আমাদের ইতিহাস লিখতে ভূমিকা পালন করেছে। তাদের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেছে।  ২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের দৈনিক বাংলা
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বরের দৈনিক বাংলা পত্রিকার প্রধান খবর ছিল ‘আজ বিজয় দিবস: আজ সংবিধান চালু হলো’। নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণ করলেন শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে নিয়াজির আাত্মসমর্পণের যে ইতিহাস তা প্রকাশিত হয় আর সঙ্গে রেসকোর্সে সবাই সেদিন যেভাবে ছিল তার একটি স্কেচ এঁকে দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া কিভাবে মুজিব পরিবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন সে নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ছিল শেষের পাতায়। মুনতাসির মামুন বলেন, তখনই ইতিহাস লেখা শুরু হয়ে গেছে। তারা যে তথ্যগুলো সামনে আনছিল সেগুলোকে প্রাথমিক তথ্য বিবেচনা করেই বহু ইতিহাসের বই লেখা হয়েছে। তারা যদি সময়টাকে ধরতে না পারতো তাহলে অনেককিছুই হারিয়ে যেত।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ব সাব্বির হোসাইন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে ৭২-এর পত্রিকাগুলো প্রসিকিউশন ডকুমেন্টারি এভিডেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির বিরুদ্ধে পাকিস্তান, বিহারি ও দালালদের বর্বরতা, মুক্তিযুদ্ধের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানার ও বুঝবার জন্য ৭২'এর পত্রিকাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় সাংবাদিকরা সারাদেশ থেকে প্রত্যক্ষদর্শী ও নিপীড়িতদের বক্তব্যকে ভিত্তি করে পাকিস্তানি বর্বরতার ওপর প্রতিবেদন করেছিলেন। এই প্রতিবেদনগুলো মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রাথমিক তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস বলে বিবেচিত হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ বিজয় দিবসের পত্রিকা


ওমর শেহাব বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী পত্রিকাগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বুঝতে ও পরবর্তীতে বিস্তারিত লিখতে কী ধরনের ভূমিকা রেখেছিল সে বিষয়ে বলতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড বাল্টিমোর কাউন্টির ডক্টরাল ক্যান্ডিডেট ও ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম-এর সদস্য ওমর শেহাব বলেন, পুরনো পত্রিকাগুলো আমাদের প্রজন্মের মানুষদের কাছে স্বর্ণখনির মতো। অনেকেই জানে না স্বাধীনতার পর পর ঈদের ছুটি আর পূজার ছুটি ছিল সমান। খসড়া সংবিধান- যার একটি মূলনীতি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা- মানুষের মতামতের জন্য সেটা পত্রিকায় ছাপানোও হয়েছিল।
স্বাধীন হওয়ার জন্য আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রচেষ্টার শুরু যে পঞ্চাশের দশকের শেষ থেকে, আবার বিজয়ের প্রথম বার্ষিকীর বিজ্ঞাপনগুলো ছিল সৃজনশীলতা আর দেশপ্রেমের অনন্য প্রদর্শনী। এই ব্যাপারগুলো আমরা জানতে পারব যদি আমরা ওই পত্রিকাগুলোতে চোখ বুলানোর সুযোগ পাই।
দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আরও বলেন, পত্রিকাগুলো জাতীয় আর্কাইভ আমাদের জন্য অনলাইনে দিতে পারে। জাতীয় আর্কাইভের এটি স্থায়ী সমৃদ্ধ ইউনিট থাকা উচিৎ যেটি নিয়মিত এই সব পত্রিকা অনলাইনে সংরক্ষণ করবে। আশা করি সরকার খুব দ্রুত এর জন্য অর্থ বরাদ্দ করবে ও পদ সৃষ্টি করবে। ৪. অবজারভারের ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ এর পত্রিকা  

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাহীদুর রহমান বলেন, এই পত্রিকাগুলো আমাদের তদন্তে অনেক ভূমিকা রেখেছে। এগুলো এত তথ্যবহুল যে এগুলোর যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেমন জরুরি তেমনই এগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। এতে ইতিহাস বিকৃতির যে প্রচেষ্টা ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘসময় ধরে হয়েছে সেটা আবার মাথাচাড়া দিতে পারবে না। ৬. ১৬ ডিসেম্বর দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পনের স্কেচের ছবি

গণমাধ্যম বিশ্লেষক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, সাংবাদিকতায় যে ধরনের লেখালেখি বা কথা বলা হয়, তার পুরোটা জুড়েই থাকে তথ্য, আর সেই তথ্য উপস্থাপিত হয় কনটেক্সট বা প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় কনটেক্সট আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। তাকে বাদ দিয়ে ইতিহাস, রাজনীতি এমনকি অর্থনীতি বিষয়ে সাংবাদিকতা করা অসম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের পরপর পত্র পত্রিকায় সেই কনটেক্সটকেই তুলে ধরার প্রয়াস ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ইতিহাসের চাকা পেছনের দিকে নেওয়ার যে চেষ্টা হয়েছিল তার সঙ্গে ছিল গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে নিষিদ্ধ করে রাখা। সে কারণে ইতিহাস বিকৃতি বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, নতুন করে যে প্রয়াস আমরা দেখছি, তাতে গুটিকয়েক গণমাধ্যম নতুন করে আবার সেই প্রচেষ্টায় আছে। কোনও মাধ্যমে খবর বা খবর বিষয়ক অন্যান্য কনটেন্ট থাকলেই তাকে গণমাধ্যম বলা যায় না। ইনফরমেশন, এডুকেশন, কমিউকেশনের যে ধারণা নিয়ে গণমাধ্যমের বিচরণ সেখানে সাংবাদিকতা গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না।

৭. ২৪ জানুয়ারী ১৯৭২ এর পত্রিকাতেই দালালদের বিচারের বিষয়টি উঠে আসে

 

ছবি কৃতজ্ঞতা: সিবিজিআর ও আইসিএসএফ

/এফএ/আপ-এসএম

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম