সমাজসেবা অধিদফতরের মিরপুরের আশ্রয়কেন্দ্রে মানসিক রোগী ও প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে একই কক্ষে রাখা হয় শিশু-কিশোরদের। তাঁদের দিয়ে করানো হয় রান্না, ঘর মোছা এবং জামা কাপড় ধোয়ার কাজ। কাজ না করলে আনসার সদস্যরা এসব শিশু-কিশোরদের মারধর করেন; যা নিয়মবহির্ভূত। তবে সমাজসেবা কর্তৃপক্ষের দাবি, স্থান সংকুলন না হওয়ায় এভাবে রাখতে বাধ্য হয় তারা।
আনসারদের অত্যাচারের প্রতিবাদ করে গত শনিবার (২৭ মার্চ) আশ্রয় কেন্দ্রের গেট ভেঙে পালিয়েছে ১১ শিশু-কিশোর। এই ঘটনায় শাহ আলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন আশ্রয়কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা।
রবিবার (২৮ মার্চ) দুপুরে মিরপুর ১ নম্বরের বি-ব্লকের ৫২/১ সমাজসেবা অধিদফতরের এই আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আট-দশ জন নারী পুরুষ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সবার চোখ তিন তলাবিশিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্রের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার দিকে। তৃতীয় তলার বারান্দার কয়েকজন বৃদ্ধ, শিশু-কিশোর ও পুরুষকে চিৎকার করে ভবনের নিচে অপেক্ষমাণদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে। ভবনের দ্বিতীয় তলায় রাখা হয়েছে নারীদের।
নিচে অপেক্ষমাণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, কারও ছেলে, কারও মেয়ে, কারও বাবা আবার কারও মাকে পুলিশ বিভিন্ন সময় পথ থেকে ধরে নিয়ে এসেছে। তাঁদের এখানে রাখা হয়েছে। শনিবার রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ঝামেলা হওয়ার পর এসব মানুষ তাঁদের স্বজনদের দেখতে এসেছেন। অনেককে আবার ফোন দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের স্বজনদের নিয়ে যাওয়ার জন্য।
বেলা সাড়ে ১২টার দিকে জীবন নামে এক কিশোরকে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁর মা ও খালা তাঁকে নিতে এসেছে। আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরের পরিবেশের বর্ণনা দিয়ে এই কিশোর বলে, ‘ভেতরে বিভিন্ন মানসিক রোগী আছে। ছোট ছোট ৫-৭ বছরের শিশু আছে। এছাড়াও বিভিন্ন বয়সের শিশু-কিশোর রয়েছে, তাঁদের সবাইকে একই কক্ষে রাখা হয়েছে।’
এই কিশোর আরও বলে, ‘মানসিক রোগীদের দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করানো হয়। টয়লেট ভরে গেলে তাদের হাত দিয়ে তা ওঠাতে বলা হয়।’
‘ভেতরে শিশু কিশোরদের দিয়ে বিভিন্ন কাজ করানো হয়। কাজ না করলেই আনসার সদস্যরা মারধর করেন।’—যোগ করে জীবন।
শনিবার রাতের ঘটনা বর্ণনা করে এই কিশোর বলে, ‘রাতে সাকিব নামে এক বড় ভাই (কিশোর) চিৎকার করছিলেন। তখন আনসার গিয়ে তাকে থাপ্পড় মারে। থাপ্পড় দেওয়ার পর সাকিব দেয়ালে আঘাত পায় এবং তাঁর মাথা ফুলে যায়। এরপর সাকিবসহ আরও কয়েকজন আনসারকে ধাওয়া দেয়, কক্ষের ভেতরে সবাই মিলে ভাঙচুর করে। পরে কলাপসি গেট ভেঙে ৯-১০ জন পালিয়ে যায়।’
সড়কে বসে নেশা করার অপরাধে জীবনকে পুলিশ আটক করে এই আশ্রয়কেন্দ্রে অনেছিল বলে তাঁর খালা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন। জীবন বলে, ‘আমি দেড়মাস এখানে ছিলাম। আমাকে কয়েকবার মারছে। কাজ করায় আবার মারেও। তাই এখানে কেউ থাকতে চায় না।’
আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরের সড়কে দাঁড়িয়ে ভবনের দিকে তাকিয়ে আছে রাকিব নামে এক কিশোর। গুলশান থানা পুলিশ তাঁর মা আনোয়ারা বেগমকে (৩৭) গুলশানের একটি সড়ক থেকে গত ২১ মার্চ ধরে নিয়ে এসেছে। একদিন তাঁর মা হারিয়ে যায়। পরের দিন জানতে পারে তাঁর মা মিরপুরের এই আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।’
বাংলা ট্রিবিউনকে রাকিব বলেন, ‘আমার মা রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করেন। তাঁর কোনও দোষ নেই। তাঁকে রাতে গুলশান অ্যাভিনিউ থেকে ধরে নিয়ে এসেছে। বিনাদোষে ধরে রেখেছে।’
আনোয়ারা বেগমের খোঁজে এই আশ্রয়কেন্দ্রে তাঁর ভাই ইলিয়াস ও রিকশাচালক স্বামী আব্দুর রহমানও এসেছেন।
দুই পোশাক শ্রমিক তরুণীকে একটি রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে গত বৃহস্পতিবার ধরে নিয়ে আসে শাহআলী থানা পুলিশ। তাঁদের এই কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। জুথি ও রুমা নামে এই দুই তরুণীর গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। মিরপুরের নগরবাগ এলাকায় পরিবারের সঙ্গেই থাকেন। জুথির বাবা জাহিদুর রহমান কিডনি রোগে আক্রান্ত। মেয়েকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। জুথি ও রুমাকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হয়।
মূলত ভবঘুরে, মানসিক রোগী ও যাদের ঠিকানা পাওয়া যায় না—তাদের এসব আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন শিশু-কিশোর অপরাধীদেরও কখনও কখনও রাখা হয়। জরাজীর্ণ এই আশ্রয়কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ করেছে শিশু-কিশোররা। শনিবারের ঘটনার বর্ণনা করে প্রত্যক্ষদর্শী মারুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দেড় বছর এখানে ছিলাম। রান্নার কাজ করতাম। এখানে রেজাউল নামে এক আনসার আছেন, যিনি সবাইকে মারেন। আনসাররা কিশোরদের মারার পরই তাঁরা গেট ভেঙে পালিয়েছে।’
গুলশানের সড়ক থেকে কাজিম উদ্দিন নামে আরেক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধকে গুলশান থানা পুলিশ আটক করে নিয়ে আসে। তাঁর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। কড়াইল বস্তিতে থাকেন। সড়কে ভিক্ষা করেন। তাই পুলিশ তাঁকে আটক করে নিয়ে এসেছে। মুক্ত হওয়ার পর কাজিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্র জেলখানার চেয়েও খারাপ। পাগল, ছোট ছোট বাচ্চা, শিশু, কিশোর, বুডো-বুড়ি সব এক কক্ষে রাখা হয়। না দেখলে এসব কেউ বিশ্বাস করবে না।’
রিকশাচালক আবুল কাসেমের এগারো বছরের ছেলে রাজুকে শাহ আলী থেকে আটক করে নিয়ে এসেছে পুলিশ। তাঁদের গ্রামের বাড়ি মির্জাগঞ্জ উপজেলায়। ছেলের কোনও দোষ নেই উল্লেখ করে আবুল কাসেম বলেন, ‘আমার ছেলেকে এখানে রাখা হয়েছে। আমি কিছুই জানি না।’
মিরপুরের এই আশ্রয়কেন্দ্রটি পুরোটাই একটি ভুতুড়ে বাড়ির মতো। সামনে রয়েছে পরিত্যক্ত ভবন, ভেতরে ভবনটির সামনের জায়গা নোংরা। দেয়াল খসে পরেছে। এর ভেতরেই শিশু, কিশোর, নারী ও মানসিক রোগীদের রাখা হয়।
মিরাজ আলী নামে এক বৃদ্ধকে ধরে নিয়ে এসেছে গুলশান থানা পুলিশ। এই বৃদ্ধর ছেলে আবুল কাসেম। তিনি বলেন, ‘আমার বাবাকে গত ১৮ মার্চ পুলিশ নিয়ে আসে। আজকে ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে আসতে বলেছে, তাই আইডি কার্ড নিয়ে এসেছি। বাবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে।’
পালিয়েছে ১১ জন
আশ্রয়কেন্দ্রে আনসারের সঙ্গে হট্টগোল ও সংঘর্ষ করে ১১ জন শিশু-কিশোর পালিয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে সাকিব, হৃদয়, রাজ, রুবেল, সোহাগ, জামাল ও সুজন। এছাড়াও কয়েকজন শিশুর মাথায়, পায়ে ব্যান্ডেজ করা দেখা গেছে। তাঁরা প্রত্যেকেই সংঘর্ষে আহত হয়েছে।
কিশোর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জিডি
আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে ১১ শিশু-কিশোর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করেছে সমাজসেবা অধিদফতর। শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবিএম আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূলত যারা ভবঘুরে, তাদের এই আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়। ১১ জন পালিয়ে যাওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা একটি সাধারণ ডায়েরি করেছে। আর কোনও আইনি ব্যবস্থা নেই। পালিয়ে গেলে জিডিই করা হয়।’
আইন অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে কিছুই হয় না
ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন-২০১১ অনুযায়ী, ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তিরা এখানে থাকবেন। যার বসবাসের বা রাত্রি যাপনের সুনির্দিষ্ট কোনও স্থান বা জায়গা এবং ভরণ-পোষণের জন্য নিজস্ব কোনও সংস্থান নেই এবং যিনি অসহায়ভাবে শহর বা গ্রামে ভাসমান অবস্থায় জীবন-যাপন করেন, তাঁদের এখানে রাখা হবে। তবে আদালতের নির্দেশে এখানে নারী, পুরুষ, শিশু কিশোর ও বৃদ্ধ রাখা হয়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সমাজসেবা অধিদফতরের আওতায় দেশে ৬টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। অসহায় ভবঘুরেদের ভরণপোষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের সমাজে কর্মক্ষম, উৎপাদনশীল নাগরিক হিসাবে পুনর্বাসিত করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। তবে বর্তমানে এসব আশ্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রম নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
এসব কেন্দ্রের নিবাসীদের আশ্রয়, ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, শরীর চর্চা, সাধারণ ব্যবহারিক ও নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক, চিত্ত বিনোদন, মানসিক উন্নয়ন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজকর্ম, উদ্বুদ্ধকরণ, পুনর্বাসন ও অনুসরণ ইত্যাদি কর্মসূচির আওতাভুক্ত রয়েছে। এছাড়ও তাঁদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলার কথা রয়েছে। তবে বর্তমানে এসব কাগজে কলমে দেখানো হয়, বাস্তবে কিছুই হয় না।
সমাজসেবা অধিদফতরের বক্তব্য
আশ্রয়কেন্দ্রেগুলোর সংকট নিয়ে সমাজসেবা অধিদফতরে দায়িত্বশীল কোনও কর্মকর্তা সরাসারি কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ভবন জরাজীর্ণ, জায়গা নেই, তাই একই কক্ষে সবাইকে রাখা হয়। বাধ্য হয়েই সবাইকে এক জায়গা রাখা হয়।’
জনসংযোগ ও সমাজসেবা কর্মকর্তা (আরও) মোহাম্মদ আছাদুজ্জামানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শনিবার রাতের ওই ঘটনার পর আশ্রয়কেন্দ্রটির পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তবে ওই ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা আশ্রয়কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা বলতে পারবেন।’
আশ্রয়কেন্দ্রেটির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার অফিসে গিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
/আইএ/









