মেয়েটাকে কোলে নিতে পারছি না: আক্ষেপ ফায়ার ফাইটার বিষ্ণুর

রিয়াদ তালুকদার
২৭ এপ্রিল ২০২১, ১৭:৫৭আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২১, ১৭:৫৭

‘একমাস হলো কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছি। কয়েকদিনের মধ্যে পূজা দিয়ে তার নাম রাখার পরিকল্পনা ছিল। এখন কিছুই করা সম্ভব নয়। এ জন্য মানসিক কষ্টে আছি।’ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটার বিষ্ণু মিস্ত্রির কথা শুনে মনে হলো, তার শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণাই যেন বেশি।

গত শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) পুরান ঢাকার মুসা ম্যানশনের আগুন নেভাতে গিয়ে একপর্যায়ে অন্ধকারে পা হড়কে পড়ে যান তিনি। ভেঙে যায় হাত ও কোমরের হাড়। রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে তার।

মঙ্গলবার এই অগ্নিযোদ্ধার সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের এ প্রতিবেদকের। বিষ্ণু বলেন, কোমরের নিচের জয়েন্ট ভেঙেছে। অস্ত্রোপচার করাতে হবে। আগামী বুধবার হওয়ার কথা রয়েছে। বলেছেন, ‘সুস্থ হয়ে আবার কাজে যোগ দিতে চাই।’

কিছুটা বিষণ্ন গলায় বিষ্ণু বলেন, ‘২৬ মার্চ আমার কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। একমাস পেরিয়েছে। হিন্দু শাস্ত্র মতে, পূজার মধ্য দিয়ে সন্তানের নাম রাখা হয়। কয়েকদিনের দিনের মধ্যেই নাম রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তা করতে পারছি না বলে যন্ত্রণা যেন আরও বেড়েছে। এখন যে পরিস্থিতি তাতে স্ত্রী-সন্তানকে বাইরেও আসতে বলতে পারছি না। আমাকে দেখতে আসতে না পারায় তাদেরও মন খারাপ। মেয়েটাকেও কোলে নিতে পারছি না বলে বেশি খারাপ লাগছে।’

ফায়ার ফাইটার বিষ্ণু

 

এ তীব্রতা ছিল অন্যরকম

আগুন নেভানোর অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে এখনও ভেসে ওই ভয়াবহতা। মুসা ম্যানশনের আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের সদরঘাট ইউনিট থেকে কয়েকটি ইউনিট আসে। পরে আরও ইউনিটের প্রয়োজন হওয়ায় সদর দফতর থেকে কয়েকটি ইউনিট যোগ দেয়। আমি ছিলাম সদর দফতর থেকে একটি ইউনিটের সদস্য। আগুন নেভাতে ভবনের পাশের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় যাই। আমরা যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েই কাজ করেছিলাম। আমার সঙ্গে আরও দুই সহকর্মী ছিলেন। আগুন নেভাতে পানি ছিটানোর কিছুক্ষণ পর তীব্রতা বেড়ে যায়। আমরা ভাবছিলাম, আচমকা এতো তাপ কোথা থেকে এলো!’

বিষ্ণু আরও জানান, ‘তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে আমরা দোতলা থেকে তিনতলার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। পানি দেওয়া শুরু করতেই আগুন ছড়িয়ে যায়। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম। যেহেতু সেখানে কেমিক্যাল ছিল। তাই পানি দেওয়ায় উল্টো বিস্ফোরণ ঘটে। ওই আগুনের তীব্রতা ছিল আমাদের ধারণার বাইরে। ওটা সহ্য করতে না পেরেই বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। তখনই আমি পড়ে যাই। সঙ্গে থাকা দুই সহকর্মী (লিডার গিয়াসউদ্দিন ও ফায়ারম্যান লিটন চন্দ্র দাস) কিছুটা আঘাত পেয়েছেন। তবে তারা অনেকটাই সুস্থ আছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘চাকরিজীবনের শুরু থেকেই অনেক আগুন নেভানোর কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি মল, বনানীর এফ আর টাওয়ার, চকবাজারসহ অনেক জায়গায় কাজ করেছি।’

 

নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন ঊর্ধ্বতনরা

‘আমার কর্মস্থলের ঊধ্র্বতন কর্মকর্তারা আমার চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। হাসপাতালে আমার দেখাশোনার জন্য আমার বড় ভাই আছেন। তিনিও ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত। এ ছাড়া অফিস থেকেও একজন করে আমার সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করছেন। তাদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’

২০১১ সালে ফায়ার সার্ভিসে যোগ দেন বিষ্ণু পাদ মিস্ত্রি। চাকরি শুরু করেন খুলনা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে। পরে ঢাকায় বদলি হয়ে সদরদফতরে যোগ দেন।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল গনি মোল্লা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামীকাল বুধবার তার (বিষ্ণু মিস্ত্রি) একটি বড় অস্ত্রোপচার হবে। ডান হাতের সোল্ডার সরে গিয়েছিল আর কোমরের হাড় ভেঙেছে। হাতের সোল্ডার জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছি। কোমরের অপারেশন হলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।’

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার ফাইটার বা যে কেউ আহত হলে আমরা তার চিকিৎসায় নজর রাখি। মুসা ম্যানশনের আগুন নেভাতে গিয়ে আহত ফায়ার ফাইটার বিষ্ণু মিস্ত্রির চিকিৎসার খোঁজখবর রাখছি। সার্বক্ষণিক ফায়ার সার্ভিসের একজন সদস্য তার দেখভাল করছেন।’

 

এ পর্যন্ত যারা মারা গেলেন

আগুন নেভানোসহ বিভিন্ন কাজে অংশ নিতে গিয়ে এ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ১৫ সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৯৮৯ সালে বগুড়া ফায়ার স্টেশনের আগুন নেভাতে গিয়ে মারা যান ফায়ারম্যান মো. মাহবুবুর রহমান। ১৯৯১ সালে নওগাঁ ফায়ার স্টেশনে ফায়ারম্যান মুসলিম উদ্দিন, ২০০১ সালে সীতাকুন্ড ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান জহিরুল হামিদ, ২০০১ সালে বরিশাল ফায়ার স্টেশনের কর্মরত ফায়ারম্যান মাহবুব হোসেন খান, ২০০৬ সালে বালাগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান আক্তার হোসেন, ২০০৮ সালে পটুয়াখালীর ফায়ারম্যান অমল চন্দ্র মন্ডল, ২০০৭ সালে লিডার আব্দুর রশিদ, ২০০৮ সালে কুলাউড়া ফায়ার স্টেশনের গাড়িচালক আব্দুল আজিজ, ২০০৮ সালে কুলাউড়া ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান নির্মল প্রসন্ন সিংহ, ২০০৯ সালে কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, ২০০৯ সালে ছাগলনাইয়া ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান মোহাম্মদ জালাল, ২০১৫ সালে গোপালগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান মো. শাহ আলম, ২০১৩ সালে নরসিংদী ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান আবু সাঈদ, ২০১৭ সালে রাজশাহী গোদাগাড়ী ফায়ার স্টেশনের আব্দুল মতিন ও সবশেষ ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল এফ আর টাওয়ারে আগুন নেভাতে গিয়ে কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান সোহেল রানা মৃত্যুবরণ করেন।

এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় অনেকে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে আবার কাজে যোগ দিয়েছেন।

/এফএ/
সম্পর্কিত
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
কদমতলীতে ইন্টারনেট সার্ভিসের ৩ কর্মীকে মারধর
কালশী বস্তিতে আগুন: একটি ঝগড়ার জেরে পথে শতাধিক পরিবার
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম