যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে কাজী আরেফসহ ৫ জাসদ নেতার হত্যাকারী তিন আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১১ টা ১ মিনিটে সাফায়েত হোসেন হাবিব ও আনোয়ার হোসেনের এবং রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে রাশেদুল ইসলাম ঝন্টুর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
কারা উপ-মহাপরিদর্শক (খুলনা বিভাগ) টিপু সুলতান, যশোরের জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর, পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, সিভিল সার্জন শাহাদৎ হোসেন, যশোর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহজাহান আহমেদ, কারাগারের পেশ ইমাম মাওলানা রমজান আলী, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল হাসান, জেলার এসএম মহিউদ্দীন হায়দার প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
যশোর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহজাহান আহমেদ স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই তিন আসামির ফাঁসি কার্যকর করতে বুধবার রাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হযরত আলী ও তানভীর রাজু নামের দুই জল্লাদ যশোরে এসে পৌঁছান। ফাঁসি কার্যকরে এদের সহায়তা করেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের আরও ৭ জন নির্বাচিত কয়েদি।
এদিকে, ফাঁসি কার্যকর শেষে মরদেহ গ্রহণের জন্য রাত ১২টার সময় দুটি অ্যাম্বুলেন্স ও একটি পিক আপ নিয়ে কারাগারের অভ্যন্তরে ঢোকেন দণ্ডিতদের স্বজনেরা।
একটি কারা সূত্র নিশ্চিত করেছে হাবিবের মরদেহ গ্রহণ করবেন তার ছেলে মিঠুন মণ্ডল, আনোয়ারের মরদেহ নেবেন তার ভাগ্নে সোহেল এবং ঝণ্টুর মরদেহ গ্রহণ করবেন তার ছেলে ডালিম।
আলোচিত এই মামলার আসামিদের ফাঁসি কার্যকরের কারণে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার ও সংলগ্ন এলাকা দিনভর ছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে কারাগারের চারপাশে নিরাপত্তা টহল আরও বাড়ানো হয়। র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশের বেশ কিছু দলকে তখন থেকেই কারাগার ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। নিরাপত্তার কারণে রাত ১০টার দিকে কারাগারের সামনের দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারাগারের আশপাশ থেকে সাধারণ লোকজনকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে কোনও রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই তিন আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের কালিদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সন্ত্রাসবিরোধী এক জনসভায় চরমপন্থী সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং জাসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাজী আরেফ আহমেদ, কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান হোসেন, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইয়াকুব আলী, স্থানীয় জাসদনেতা ইসরাইল হোসেন ও সমশের মণ্ডল।
ঘটনার পরদিন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার এসআই মোহাম্মদ ইসহাক আলী বাদী হয়ে ২৯ জনের নামে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে আদালত ২৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার শুরু করেন।
মামলার বিচার শেষ কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত দায়রা জজ ২০০৪ সালের ৩০ আগস্ট ১০ আসামিকে ফাঁসি ও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া ১০ আসামি হলেন ইলিয়াস, রাশেদুল ইসলাম ওরফে ঝন্টু, সাফায়েত হোসেন হাবিব, আনোয়ার হোসেন, শাহিরুদ্দিন, মান্নান মোল্লা, বাকের, রওশন, জাহান ও জালাল। যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশ প্রাপ্তরা হলেন, রাফাত ওরফে রাফা, গারেস, তাসিরুদ্দিন, আসগর জোয়ারদার, নজরুল ইসলাম, ওয়ালিউর রহমান, একুব্বার, টিক্কা ওরফে জব্বার, লাবলু, ফিরোজ ওরফে ফরু, লাল্টু ওরফে নুরুজ্জামান।
২০০৮ সালের ৫ আগস্ট দণ্ডাদেশপ্রাপ্তরা হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের রায়ে হাইকোর্ট যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের দণ্ড থেকে খালাস দেওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত শাহিরুদ্দিনকেও খালাস দেন। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বাকি ৯ আসামির দণ্ড কার্যকরের অনুমতি দেন হাইকোর্ট। এরপর হাইকোর্টের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিলের আবেদন করে।
অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকায় ইলিয়াস হোসেন, রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু ও আনোয়ার হোসেন হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন।
২০১১ সালের ৬ আগস্ট আপিলের রায়ে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখা হয়। ফলে ইলিয়াস, রাশেদুল ও আনোয়ারের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এর মধ্যে আনোয়ার হোসেন ও রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। রিভিউ আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে তা খারিজ করা হয়। এছাড়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামি ইলিয়াস কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।
/জেবি/এমএনএইচ/টিএন/








