পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুড়ে যাওয়া ওয়াহেদ ম্যানশন খুলে দিতে চায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটি বলছে, অগ্নিকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ওয়াহেদ ম্যানশনের সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। মালিক পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তারা ভবনটি খুলে দিতে চাচ্ছেন। তবে এজন্য ভবন মালিকদের কিছু শর্ত মানতে হবে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি।
চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর ওয়াহেদ ম্যানশনসহ পাশের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ পেশ করার জন্য অগ্নিকাণ্ডের পরদিন ডিএসসিসির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিমের নেতৃত্বে গঠিত ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ডিএসসিসি। কমিটিকে পরবর্তী সাত কর্মদিবসের মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪৫ দিনের মধ্যে ভবনটির ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট (ডিইএ) করতে হবে। ডিইএ’র রিপোর্ট অনুযায়ী পরের ১৫০ দিনের মধ্যে নতুন করে প্রয়োজনীয় মজবুত (রেট্রোফিটিং) করতে হবে। এ দুটি সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ভবনটি ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া বাকি চারটি ভবনের সামনের দিকের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ভেঙে মেরামতের পর ডিএসসিসি ও রাজউকের যথাযথ অনুমোদনের পর ব্যবহার করা যেতে পারে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে বিস্ফোরণ ও আগুনের কারণে ওয়াহেদ ম্যানশনের কলাম ও বিমের যেসব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পুড়ে যাওয়া সেসব অংশ পুরোপুরি ফেলে দিতে হবে। এরপর নতুন করে রড ও কংক্রিটের মজবুত ঢালাই দিতে হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের জন্য ভবনটি কতটা নিরাপদ সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পুরো ভবনটির একটি বিস্তারিত প্রকৌশলগত মূল্যায়ন (ডিটেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট-ডিইএ) করাতে হবে। এ জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে পুরো ভবনের সব কলাম, বিম, স্ল্যাব পরীক্ষা করাতে হবে। এ সংক্রান্ত সার্টিফিকেট পাওয়ার পর ভবনটি ব্যবহার করার অনুমোদন প্রদান করা যেতে পারে।
জানা গেছে, নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে গত বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ডিএসসিসির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপস। তখন ভবন মালিক ও ডিএসসিসির স্থানীয় ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের বহিষ্কৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের লোকজন মেয়রকে ভবনটি খুলে দেওয়ার দাবি জানান। মেয়র ভবনটি ঘুরে দেখেন।
ভবনটি প্রসঙ্গে তাপস বলেন, গত বুধবার আমি চুড়িহাট্টা পরিদর্শনে যাই। সেখানে গেলে আমার কাছে একটি নথি আসে। তাদের দেখা গেছে সংস্কারের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছিল। কমিটিকে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী দুর্ঘটনার পর ভবনটির সংস্কার করা হয়েছে। সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মালিকরা তাদের ভবন ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছেন।
মেয়র আরও বলেন, মূলত ভবনটি সংস্কারের কাজ কতটুকু হয়েছে তা দেখার জন্যই সরেজমিন গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেখানে গিয়ে দেখলাম ভবনটি নিখুঁতভাবে সংস্কার করা হয়েছে।
তাপস জানান, দুর্ঘটনার পর যে কমিটি করা হয় তারা পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছিল। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নকশা প্রণয়ন ও পুনঃসংস্কার করা হয়েছে। সুতরাং এখন ওয়াহেদ ভবন চালু করতে বাধা নেই। সেটি চালু করা যেতে পারে। চারতলা ওই ভবনের ৯ তলার ভিত্তি রয়েছে। আমি বলেছি কোনোভাবেই চার তলার ওপরে নেওয়া যাবে না। মালিকদের অবশ্যই অঙ্গীকার দিতে হবে, তারা সেখানে কোনোভাবে ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না। সেখানে কোনও রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থ রাখবে না।
ওয়াহেদ ম্যানশন ছাড়াও পাশের চারটি ভবন (হোল্ডিং নং-৬৫, ১৮, ১৭ এবং চুড়িহাট্টা মসজিদ) বাহ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনগুলোর সামনের দিকের বর্ধিত অংশ ভেঙে মেরামত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, মেরামতের পর ডিএসসিসি ও রাজউকের যথাযথ অনুমোদনের পর ব্যবহার করা যেতে পারে।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিটি গঠনের পরদিন সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ওয়াহেদ ম্যানশনসহ আরও চারটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শন শেষে কমিটি ওয়াহেদ ম্যানশনের আল্ট্রাসনিক পালস ভেলোসিটি (ইউপিভি) ও কার্বোনেশন টেস্ট অব কংক্রিট-এর সিদ্ধান্ত নেয়। এরইমধ্যে এ দুটি সম্পন্ন হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সেদিনই ৬৭ জন ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ছয় জনের প্রাণহানি ঘটে।
আরও পড়ুন:
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন: এখনই ব্যবহার করা যাবে না ওয়াহেদ ম্যানশন









