কোনও একটা ট্রাক থামলেই সদলবলে দর কষাকষিতে লেগে পড়ছেন কিছু মানুষ। গাট্টি-বোচকা হাতে এই মানুষগুলোর অধিকাংশই এই মহানগরের রিকশাচালক। উদ্দেশ্য- গ্রামের বাড়িতে ফেরা। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও ট্রাকে একটু ঠাঁই চাই তাদের। দেশব্যাপী কঠোর লকডাউনের চতুর্থদিন রবিবারের (৪ জুলাই) প্রথম প্রহরে এ চিত্র রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র কারওয়ান বাজারের।
ফেরার অপেক্ষারতরা জানালেন, করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমাতে সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউনে সব বন্ধ; এসময় রিকশার যাত্রীও নেই তেমনটা, তাই বাড়ি ফিরতে হবে তাদের। ৩৫ বছর বয়সী যুবক ইয়াসিনের বাড়ি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায়। এত ঝুঁকি নিয়ে গ্রামে ফিরছেন কেন প্রশ্ন করতেই তার জবাব, ‘ভাড়া নাই, সারাদিনে টিপ মারছি ৮০ টাকার। যাত্রী না হইলে ক্যামন করি থাকমো এই শহরত?’ ইয়াসিনের কণ্ঠে বাড়ি ফেরার উদ্বেগ, বললেন, ‘ট্রাক ছাড়া তো উপায় নাই বাড়ি যাওয়ার, তাই এত রাইতে যাইতে হচ্ছে’।
রবিবার প্রথম প্রহরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার মোড়ের পান্থপথ অংশে কলাবাগান থানার প্রবেশপথ এলাকায় ইয়াসিনের মতো আরও কয়েকশ মানুষকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। ছুটে চলা ট্রাক খালি দেখলেই থামিয়ে ভাড়া দরদামে লিপ্ত হন তারা। অধিকাংশের মুখেই মাস্ক। এ প্রতিবেদককে দেখে উৎসুক একজনের খেদোক্তি, ‘বলতে গেলে কোনও ইনকাম নাই। কেমন করে থাকবো তাইলে এখানে; বলেন! কাম না থাকলে এখানে থাকা যায় না। জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার নাম সালাম, এই শহরে রিকশা চালাই; গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর নবাবগঞ্জ উপজেলায়।’
সালাম ও তার বাড়িফেরার সঙ্গীরা কথায়-কথায় জানালেন, তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রিকশা চালান। কেউ যাত্রাবাড়ী, কেউ লালবাগ, কেউ বাড্ডা, আবার কেউ গুলশান এলাকায়। গাইবান্ধা থেকে প্রতি মাসেই রিকশা চালাতে আসেন আবদুল আজিজ। চল্লিশোর্ধ্ব আজিজ মাসের অর্ধেক সময় রিকশা চালিয়ে উপার্জিত অর্থ নিয়ে ফেরেন গ্রামে, বাকি সময়টা গ্রামেই কৃষিকাজ করে কাটান। গত ১৫-১৬ বছর ধরে এভাবেই ঢাকা আর গ্রামের বাড়ি যাওয়া-আসার মধ্যেই জীবনযাপন করছেন আবদুল আজিজ। তার এক কন্যা ও এক ছেলে সন্তান রয়েছে, তারা একজন অষ্টম শ্রেণি, অন্যজন চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। আজিজের দাবি, এবারের লকডাউনে শহরে আবার ফেরার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার।
গত ২৬ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ১ জুলাই থেকে সাতদিনের লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সারাদেশে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি ও মৃত্যুর ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় লকডাউন বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, চলমান এই লকডাউন আরও বাড়তে পারে।
রিকশাচালক আবদুল আজিজ বলেন, ‘কবে আবার (ঢাকায়) ফিরতে পারমো (পারবো) জানি না। লকডাউন কবে শ্যাষ (শেষ) হবে কে জানে! বাড়িতেই কাজবাজ করমো (করবো)।’
রবিবার (৪ জুলাই) রাত পৌনে ১টার দিকেও বাড়িফেরা রিকশাচালকদের আলাপে গমগম করছিল কারওয়ান বাজার মোড় এলাকা। রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে বাড়ির ফেরার উদ্বেগও বাড়ছে চালকদের; কিছু ট্রাক এসেই মিলিয়ে যায় সামনের দিকে- আর কিছু ট্রাক গতি কমালেই হুড়মুড়িয়ে ব্যাগ-পোটলাসমেত পরিবারের উদ্দেশ্যে চড়ে বসেন রিকশাচালকরা। বগুড়া জেলার মোহাম্মদ দুলাল হোসেন আকন্দ জানান, অন্য প্রায় প্রতিবারই ট্রাকে করেই বাড়ি ফেরেন তিনি। তবে এবার লকডাউনের পাশাপাশি পথে-পথে চাঁদাবাজি থাকায় ভাড়া নেওয়া হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি।
বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় এই লোকগুলোর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, লকডাউনের প্রভাবে সৃষ্ট কর্মসঙ্কটে পড়ে রিকশাচালকেরা এভাবে প্রতিরাতেই রাজধানী ছাড়ছেন। গত তিনদিন ধরেই রাজধানীর গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, বিমানবন্দর, উত্তরা, ডেমরাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শত-শত রিকশাচালক ঢাকা ছাড়ছেন। খাদ্যের নিশ্চয়তা আর যাত্রীর সংখ্যা কম হওয়ায় ঢাকা ত্যাগের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়বে বলেও মনে করেন তারা।









