বুধবার (৭ জুলাই), ঘড়ির কাঁটা তখন ৯টার ঘর পেরিয়েছে মাত্র। বীর উত্তম সিআর দত্ত সড়কের মোতালেব প্লাজা শপিং মলের সামনে কয়েকশ তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষের জটলা। কাছে গিয়েই দেখা গেল আসলে সড়কের পাশে দাঁড়ানো পিকআপের সঙ্গে বোঝাপড়া চলছে তাদের। কোথায় যাবেন আপনারা- জিজ্ঞাসা করতেই ঘিরে দাঁড়ালেন বেশ কয়েকজন। ক্ষোভের সঙ্গে বললেন- খাবার নেই, দোকান বন্ধ, কবে খুলবে তাও ঠিক নাই। তাই বাড়ি চলে যাচ্ছি আমরা।
জটলা থেকে বেরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন কয়েকজন টাইলস-শ্রমিক। তারা জানান, অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক আছে, যারা টাইলসের দোকানে কাজ করেন। লকডাউনে অনির্দিষ্টকালের জন্য দোকান বন্ধ থাকায় ঢাকায় থাকা-খাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে। তাই সন্ধ্যার পর থেকে পিকআপ আসে। সেগুলোর সঙ্গে চলছে কথাবার্তা, ভাড়া ঠিকঠাক হলে উঠে পড়বেন পিকআপে। এভাবে গভীর রাত পর্যন্ত যাত্রী বুকিং চলবে সি আর দত্ত রোডে।
এরপর কথা হলো এক পিকআপ চালকের সঙ্গে। নাম জিজ্ঞাসা করলে জানালেন- মোতালেব, সঙ্গে এও জানালেন এটি তার প্রকৃত নাম নয়। তিনি বলেন, ‘আজ তার পিকআপে যারা যাবেন, তাদের বেশিরভাগই ভোলার, নোয়াখালী হয়ে যাবেন তারা। ভাড়া নোয়াখালী পর্যন্ত চারশ টাকা।’ ভাড়া কি বেশি নেওয়া হচ্ছে, প্রশ্নে মোতালেবের কণ্ঠে ক্ষোভ- ‘ব্রিজে টোল ফি, রাস্তায় খাবার, আর পুলিশকে পথে-পথে উপরি দিতে হবে। এরপর থাকবে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার।’
মোতালেব প্লাজার পাশেই একটি টাইলসের দোকানে কাজ করেন মোহাম্মদ শাহজাহান নামে এক তরুণ। কথা হলো তার সঙ্গেও। চাকরি আছে, তবুও লকডাউনের বিধিনিষেধের মধ্যে বাড়ি যেতে হচ্ছে কেন- জানতে চাইলে শাহজাহান বলেন, ‘ছয়দিন থেকে দোকান বন্ধ। মালিক বলে দিয়েছেন, কবে খুলবে জানা নাই। এখন শহরে কীভাবে থাকবো। থাকা-খাওয়াতেই তো সব শেষ। তাই বাড়ি যাইগা সবাই।’
শাহজাহানের সঙ্গে থাকা আরেকজনের মন্তব্য, ‘ট্যাহাটুহা শেষ। কোনও খাবার সহায়তাও নাই। নানান জন নানা কথা বলে, কেউতো একটু খাবার দেয় না। দশ কেজি চালও দেয় নাই এই কয়দিনে।
টাইলসের দোকানে কাজ করেন- এমন এক স্টাফের ভাষ্য, পুরো হাতিরপুল, বাংলামোটর এলাকায় অন্তত দুই হাজার টাইলসের দোকান আছে। এসব দোকানে গড়ে পাঁচ-ছয়জন স্টাফ থাকে। যারা টাইলস লোড করে, ক্রেতার সামনে টাইলস তুলে ধরাসহ নানা ধরনের কাজ করে। এসব দোকানে অন্তত দশ হাজার স্টাফ আছে বলে দাবি তার।
টাইলস দোকানের সহকারী শাহজাহান বলেন, প্রতিদিনই এখান থেকে গড়ে ১০০-২০০ জন করে গ্রামে যাইতেছে। আমাদের বেশিরভাগের বাড়ি ভোলা, আজকে যারা যাচ্ছি। নোয়াখালী হয়ে যেতে সুবিধা, তাই পিকআপে নোয়াখালী, সেখান থেকে নদী পেরোলেই ভোলা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাত ১০টার দিকে সি আর দত্ত সড়কের দুই পাশেই রাখা অন্তত ১০-১২টি পিকআপ ভ্যান, দরদাম চলছে বাড়িফেরা মানুষদের সঙ্গে। চলছিল হৈ-হৈ রব, পুলিশের গাড়ি বা সাইরেন শুনলেই সবাই সতর্ক হয়ে সরে যান অন্ধকার ফুটপাতের দিকে।
বুধবার (৭ জুলাই) রাত সোয়া ১০টার দিকে কাওরান বাজার মোড়ের পান্থপথ অংশে দেখা গেল শতাধিক মানুষ, বিভিন্ন বয়সের; ব্যাগ, গাট্টি নিয়ে অপেক্ষা চলছে বাড়িফেরার বাহনের। কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। পান্থপথ রোডের অংশের দক্ষিণ পাশের ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন কয়েকজন। এগিয়ে যেতেই মুখে মাস্ক টেনে নিলেন তরুণ কয়েকজন। আলাপে জানালেন- তাদের কেউ পোশাক কারখানার কর্মী, কেউ স্বল্প পুঁজির কোম্পানিতে কাজ করছিলেন। স্বনামে কেউ-ই উদ্ধৃত হতে রাজি নন তাদের। একজন বললেন, গ্রামে যেতে হবে। কাজ বন্ধ থাকায় শহরে থাকা কঠিন।’
কীভাবে যাবেন তবে, এমন প্রশ্নের জবাবে লাল গেঞ্জি পরিহিত একজনের মন্তব্য, ট্রাকে যাবো। আমরা যাবো বগুড়া। সামনে ঈদ আসতেছে, পরিবারের সঙ্গে ঈদ করবো। আবার লকডাউন শেষ হয়ে গেলে ফিরবো।
তাদের পাশেই ফুটপাতে হাঁটুমুড়ে বসে গাড়ির অপেক্ষা করছিলেন রিকশাচালক মো. দুলাল মিয়া। যাবেন গাইবান্ধা। কথায় কথায় তিনি জানালেন, তাদের একটি বড় ট্রাক আগেই ভাড়া করা হয়েছে। সড়কের পাশে দাঁড়ানো ট্রাকটি। বৃষ্টি থেকে যাত্রীদের বাঁচাতে হলুদ ত্রিপল জুড়ানো হয়েছে ট্রাকে।
দুলাল মিয়া জানান, বুধবার রাত ১১টায় ট্রাক ছাড়বে। গাইবান্ধা যেতে তাকে ভাড়া হিসেবে দিতে হয়েছে ৮০০ টাকা। সেখানে পৌঁছানোর পর এ টাকা দেবেন তিনি। পান্থপথ থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রাকটির শেষ গন্তব্য পঞ্চগড়।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ১ জুলাই থেকে সাতদিনের লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সারাদেশে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি ও মৃত্যুর ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় লকডাউন বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বুধবার (৭ জুলাই) লকডাউনের ষষ্ঠদিন পার হয়েছে।









