সোমবার (৩ আগস্ট) চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম্রকাননে ঘেরা সার্কিট হাউস সংলগ্ন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়কের পূর্ব দিকে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিনের একটি ভাস্কর্য ও স্মৃতি ফলক উন্মোচন করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের পর ভাস্কর্য দেখে এলাকাবাসী ও সহযোদ্ধারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এ কোন মহিউদ্দিন? আমরা যাকে চিনতাম তার সঙ্গে এ ভাস্কর্যের কোনও মিল নেই।’
যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক সভাপতি ভাস্কর আমিরুল মোমিনিন জানান, তাকে দাড়িওয়ালা সাদাকালো একটি ছবি দেওয়া হয়েছিল। দাড়ি থাকায় সাদা ভাস্কর্য তৈরির ফলে বয়স্ক দেখাচ্ছে। উদ্বোধনের আগে এটা তাকে দেখানোর কথা থাকলেও নাকি দেখানো হয়নি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পৌরমেয়র বলছেন, ‘ভাস্করকে দেখানোর তো কারণ নেই। উনি নিজে জিনিসটি তৈরি করে জেলা প্রশাসনে পাঠিয়েছেন। তাকে আবার কেন দেখানো হবে?’
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলন মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আবদুস সামাদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভাস্কর্যটা বিকৃত। ওর চেহারার সঙ্গে কোনও মিল নেই। যুদ্ধের সময় দাড়ি ছিল। কিন্তু সেটা এমন ছিল না। জেলাপ্রশাসকের কার্যালয়ে থাকা ফটোগ্যালারিতেও সেই ছবি দেওয়া আছে। সেটার সঙ্গেও মিল নেই। এটা তাড়াহুড়ো করে বানানো।’
আমিরুল মোমিনীন বলেন, ‘জেলা প্রশাসন থেকে দাড়িওয়ালা একটি ছবি দেওয়া হয়। ডিসি বলেছিলেন দাড়িওয়ালা ছবিটা আগে তেমন কেউ দেখেনি। এটা দিয়েই করতে চাই।’
ভাস্কর্যটা বানাতে কতদিন লাগলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিন-চার মাস লেগেছে। এ কাজগুলো সাধারণত আমরা সিনিয়র শিক্ষকরা করি না। আমাদের সেরা ছাত্ররা করে আমাদের তত্ত্বাবধানে।’
তিনি আরও জানান, ‘বানানোর পরে কারেকশন থাকলে করা হবে বলার পরও হুট করে শুনি উদ্বোধন হয়ে গেছে। আর পুরোটা সাদা হওয়াতে একটু ঝামেলা হয়েছে। দাড়ি সাদা হলে বয়সও বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষকে এসব বোঝানো কঠিন। দেখছি কী করা যায়। প্রয়োজন হলে নতুন করে গড়া হবে।’
ভাস্কর আমিরুলের কথার জবাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পৌরমেয়র নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি তৈরি করে পাঠিয়েছেন। এখন দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে হবে? এমন যদি হতো, অন্য কেউ তৈরি করেছেন, আর তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে মত দেবেন, তখন তাকে দেখানোর বিষয় ছিল। আমিও বলেছি, ভাস্কর্য দেখে বয়স্ক মনে হয়।’
বিষয়টি নজরে এসেছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক মো. মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন, ‘আগের প্রশাসক (যিনি কাজটি শুরু করেছিলেন) যে ছবিটা দিয়েছিলেন সেটা শহীদ হওয়ার আগের। তার সহকর্মীর কোনও এক বইতে ছবিটা আছে। উনি সেরকমই বানাতে বলেছিলেন। যাতে মৃত্যুর আগের চেহারা তুলে আনা যায়। কিন্তু যখন দেখলাম, মনে হলো বয়স্ক ছাপ এসে গেছে। উনিতো তরুণ ছিলেন। ঠিক ফুটে ওঠেনি। ২২-২৩ বছরের যুবকের চেহারা এমন হয় না।’
এই বিকৃত ভাস্কর্য তৈরির পরম্পরা বহুদিন ধরেই সমালোচিত হয়ে আসছে। রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ‘রত্নদ্বীপ’, হোটেল শেরাটনের সামনে ‘রাজসিক’, পরীবাগ মোড়ে ‘জননী ও গর্বিত বর্ণমালা’, ইস্কাটনে ‘কোতোয়াল’, তেজগাঁওয়ের সাত রাস্তায় ‘ময়ূর’, মতিঝিলের ‘বক’, এয়ারপোর্ট গোল চত্বরের ভাস্কর্য, নৌবাহিনীর সদর দফতরের সামনে ‘অতলান্তিকে বসতি’, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ের ভাস্কর্য, বঙ্গবাজারে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন শিল্পকর্ম ঘিরে নানা সময়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। রাজধানীতে হোটেল রূপসী বাংলার (শেরাটন) সামনে স্থাপিত মৃণাল হকের আরেকটি আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্যের নাম ‘রাজসিক’। এই ভাস্কর্যটিতে দু’টি ঘোড়া একটা গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কোচোয়ান বসে আছেন সামনে, গাড়ির পেছনে একজন প্রহরী। আর গাড়িতে আছেন নবাব সলিমুল্লাহ, যিনি সপরিবারে নগরীর হালচাল দেখতে বের হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভেতরে যে নবাব বসে আছেন, সেটি মোটেও দৃশ্যমান নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন মনে করেন, ঢাকার ৯০ শতাংশ ভাস্কর্য কুরুচিপূর্ণ। শহরে ভাস্কর্য থাকতে হবে উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘শিল্পের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে এই ভাস্কর্যগুলো সরিয়ে নেওয়া উচিত। ভাস্কর্য যারা বোঝেন, তাদের পরামর্শ নিয়ে যথাযথ ভাস্কর্য স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। চলতি পথে, সড়ক দ্বীপে চাইলাম আর কিছু একটা বানিয়ে ফেললাম, এতে শহরের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার সিদ্ধান্ত নেবে ঠিকই, কিন্তু সেটা অবশ্যই হতে হবে শিল্পের বিচারে। সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য অপসারণ নিয়ে যেভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তার তীব্র প্রতিবাদ করি। আবার কে কীভাবে এই ভাস্কর্যটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে, তাও আমাদের জানা নেই।’









