সৌদি আরব শর্ত দিয়েছে যারা করোনার টিকা নিয়েছেন কেবল তারাই যেতে পারবেন ওমরাহ পালন করতে। তবে এখানেও আছে দুটো বড় ‘যদি।’ যদি তারা ফাইজার, মডার্না, অ্যাস্ট্রাজেনেকা বা জনসনের টিকা নিয়ে থাকেন, তাহলে ওমরাহ করতে যেতে পারবেন। যারা শুধু চীনের সিনোফার্ম টিকা নিয়েছেন তারও যেতে পারবেন, যদি তারা চীনের এই দুই ডোজের পাশাপাশি অন্য চারটি কোম্পানির কোনও একটির বুস্টার ডোজ নেন।
সৌদি সরকারের এমন শর্ত কীভাবে পূরণ করা সম্ভব, কিংবা আদৌ সম্ভব কিনা- তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে বিশেষজ্ঞ মহলের। তাদের মতে, কোনও ধরনের টিকারই বুস্টার ডোজ দেশে দেওয়া হচ্ছে না। আর তাছাড়া একই মানুষের দেহে দুই ধরনের টিকা নেওয়া নিরাপদ কিনা- সেটিও এখনও প্রমাণিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকেও দুই ধরনের টিকা নেওয়ার কোনও অনুমোদন পাওয়া যায়নি। তাহলে সৌদি কর্তৃপক্ষের চাহিদা কীভাবে মেটানো যাবে- এমন প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের।
ওমরাহ পালনের জন্য পূর্বশর্ত হিসাবে সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ফাইজার-বায়োএনটেকের ২ ডোজ, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২ ডোজ, মডার্নার ২ ডোজ কিংবা জনসন অ্যান্ড জনসনের ১ ডোজ টিকা যারা নিয়েছেন তাদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। আর যদি কেউ চীনের সিনোফার্ম-এর টিকা নেয়, তবে বুস্টার ডোজ হিসেবে ফাইজার, অক্সফোর্ড, মডার্না, জনসনের ডোজ নিতে হবে। তাদের আরোপিত এই শেষ শর্তটি নিয়েই যত বিপত্তি।
দেশের জাতীয় টিকা বিষয়ক পরামর্শক কমিটি (নাইট্যাগ)-এর সদস্য ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদের মতে, সৌদি কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত মোটেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। তারা নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনও সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের টিকার ক্ষেত্রে কেউ হঠাৎ করেই কিছু চাইবে সেটা হতে পারে না। এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হতে হবে। কারণটা হলো, আমরা এখনও তার সেফটি জানি না। বুস্টার ডোজ দিলে নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত হবে, সেটাই এখনও অজানা।’
অন্য কোম্পানির ভ্যাকসিনের মাধ্যমে বুস্টার ডোজের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক কোনও অ্যাভিডেন্স নেই জানিয়ে অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা এফডিএ এর অনুমোদন দেবে না। এ ধরনের একটা শর্ত আরোপের আগে সৌদি সরকারের উচিত ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে কথা বলে নেওয়া। কারণ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিকমেন্ডেশন ছাড়া এমন কথা বলার এখতিয়ার কারও নেই। সৌদি আরব নিজেদের ইচ্ছামতো কিছু বলবে, শর্ত দেবে- এটা হতে পারে না।’
অধ্যাপক বে-নজিরের মতে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত এখন সৌদি আরবকে এ সম্পর্কে জানানো, এ নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা।
এর আগে দেশে আটকে পড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য ফাইজার বা মডার্নার টিকা নেওয়ার একটা বাধ্যবাধকতা ছিল। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে যতদিন ফাইজার এবং মডার্নার টিকা ছিল আমরা তাদের সেটা দিয়েছি। তাদের টিকা পাওয়া নিশ্চিত করতে ফাইজার এবং মডার্নার দ্বিতীয় ডোজ হাতে রেখে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘ফাইজারের টিকা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন মডার্নার দ্বিতীয় ডোজ চলছে। এর বাইরে আমাদের কাছে এই দুটো টিকা নাই। সেক্ষেত্রে আমরা কোথা থেকে দিবো?’
টিকা নিয়ে এক ধরনের বৈশ্বিক রাজনীতি চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চীনের ভ্যাকসিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত। পৃথিবীর ৪৫টি দেশে এটি দেওয়া হচ্ছে। খারাপ হলে তো আর কেউ দিতো না। আর আমাদের সে ক্ষমতা নেই যে চাইলেই ফাইজার বা মডার্না নিয়ে আসা যাবে। আরও ৬০ লাখের মতো ফাইজারের টিকা আসার কথা রয়েছে। সেটা এলে দেওয়া যাবে। এছাড়া তো আমাদের কিছু করার নেই।’
তবে একেক দেশের পলিসি একেক রকম মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, ‘কোনও দেশ যদি তার নিজস্ব আইন প্রয়োগ করতে চায়, সে বিষয়ে আমরা কিছু করতে পারি না, সে ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে অন্য ভ্যাকসিনের বুস্টার ডোজ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনও অনুমোদন নেই। তাই আমরা সেটা দিতে পারবো না।’
প্রসঙ্গত, করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ দেড় বছর বিদেশিদের ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি দেশটি। সম্প্রতি বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে ১ মুহররম থেকে বিদেশিদের ওমরাহ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে সৌদি আরবে যেতে শুরু করেছেন ওমরাহ পালনকারীরা। তবে বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালনের প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি। হজ এজেন্সির মালিকরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালনকারীদের সৌদি যাত্রা শুরু হতে পারে সেপ্টেম্বর থেকে। তবে নানা ধরনের শর্ত ও বিধিনিষেধের কারণে শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত ওমরাহ পালনকারী পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছে এজেন্সিগুলো।









