ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুমের মরদেহ নিয়ে উড়োজাহাজ রানওয়ে থেকে চলে আসলো এপ্রোন এলাকায়। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন তার সহকর্মী পাইলটরা। উড়োজাহাজ সামনে আসতে মাথার ক্যাপ খুলে শ্রদ্ধা জানালেন পাইলটরা। তাদের চোখে জল।
বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে বিমানের একটি ফ্লাইট তার মরদেহ নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। উড়োজাহাজটি থেকে নামলো তার মরদেহবাহী কফিন। সেই কফিনও কাঁধে তুলে নিলেন সহকর্মী পাইলটরা।
মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর আলী। এসময় বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন।
এরপর বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পক্ষে ফুল দেন সংস্থার চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ-উল আহসান।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল, বিমানের পরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ, মো. মাহবুব জাহান খানসহ বিমানের কর্মকর্তারাও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি প্রতিনিধি দলও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
এরপর পাইলটরা নওশাদের মরদেহের সামনে আসেন। টুপি খুলে, স্যালুট দিয়ে তাকে শ্রদ্ধা জানায়। তাদের অনেককেই চোখ মুছে দেখা যায়।
সবশেষে পাইলট নওশাদকে বহনকারী কফিনটি একটি ফ্রিজিং ভ্যানে তোলা হয়। এরপর ভ্যানটি তার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো শেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী মোহাম্মদ মাহবুব আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাইলট নওশাদের অকাল মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। উনার মৃত্যু আমাদের বিমান পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় উনার মৃত্যু একটা ভিন্ন মাত্রা বহন করে।’
তিনি বলেন, ‘যে মুহূর্তে এই ঘটনা ঘটে, তখন বাপা, বিমানের এমডির সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে চিকিৎসা ভালো হবে; পৃথিবীর যে কোন জায়গায় উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পাইলট নওশাদ শুরুতেই সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। তিনি কোমায় ও লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। উনার চিকিৎসার ব্যাপারে কোনও ধরনের ত্রুটি করা হয়নি।’
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দোহা থেকে আসা একটি ফ্লাইট দেশে ফেরার পথে ভারতের নাগপুর থেকে ক্যাপ্টেন নওশাদের মরদেহ নিয়ে এসেছে। একই ফ্লাইটে তার বোন দেশে এসেছেন।
জানা গেছে, দুপুরে বিমানের প্রধান কার্যালয়ে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে।
গত ২৭ আগস্ট ওমানের রাজধানী মাস্কাট থেকে ১২৪ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে ভারতের রায়পুরের আকাশে থাকাকালে হুট করে হার্ট অ্যাটাক করে নিথর হয়ে পড়েন ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম। তখনই ককপিটের কন্ট্রোল নেন সঙ্গে থাকা ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম। মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে ক্যাপ্টেন নওশাদকে ও যাত্রীদের নিয়ে উড়োজাহাজটি দ্রুত নাগপুরের ড. বাবা সাহেব আম্বেদকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হন থাকা ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম। নাগপুরের একটি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন নওশাদ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ আগস্ট মারা যান নওশাদ।
নওশাদ আতাউল কাইউম ১৯৭৭ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে পাইলট হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ২০০০ সালের ১৩ নভেম্বর ক্যাডেট পাইলট হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কাজে যোগদান করেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এফ-২৮ এর ফার্স্ট অফিসার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি ২০০৬ সালের ১৪ মে এয়ারবাস-এ-৩১০ উড়োজাহাজের ফার্স্ট অফিসার এবং ২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বোয়িং ৭৭৭ এর ফার্স্ট অফিসার হন। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি বোয়িং ৭৩৭ এর ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন এবং মৃত্যুর পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত তিনি এ পদেই কর্মরত ছিলেন।
তারা বাবা আব্দুল কাইয়ুমও একসময় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ক্যাপ্টেন ছিলেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় ‘কোরিয়ান এয়ার’ এবং ‘সৌদি এয়ারলাইন্সেও’ দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র এই পাইলট। ৬ মাস আগে নওশাদের বাবা আব্দুল কাইয়ুম মারা যান।









