কল্যাণপুর পোড়াবস্তির এক নারীসহ ছয় বয়স্ক বাসিন্দাকে আলোচনার কথা বলে মিরপুর মডেল থানায় নিয়ে ৮ ঘণ্টা হাজতে আটকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের অপরাধ তারা ওই বস্তিতে বাস করেন। বস্তি উচ্ছেদের আগে যাতে তারা নিজেরাই সেখান থেকে সরে যান সেজন্য তাদের থানায় এনে বলে দেওয়া হয়। যদিও ওই বস্তি উচ্ছেদে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য আসলামুল হক বস্তিটির উচ্ছেদ চান। তাই পুলিশ এই চেষ্টা করছে বলে সেখানকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৭ টার দিকে মিরপুর মডেল থানায় কল্যাণপুর পোড়া বস্তি থেকে আটকের ব্যাপারে ডিউটি অফিসারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘তাদের হাজতে রাখা হয়েছে। এরপর ওসি ভূঁইয়া মাহবুবের কক্ষে গেলে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কনস্টেবল জানান,‘এমপি আসলামুল হকের সঙ্গে কথা বলছেন স্যার।’ এরপর এই প্রতিবেদকসহ আরও কয়েকজন সাংবাদিক তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি অপেক্ষা করিয়ে তাদের সঙ্গে আর কথা বলতে রাজি হননি। পরে মুঠোফোনে কয়েকবার ফোন দিলে তিনি খুব অসুস্থ বলে জানান।
রাত ৮ টার দিকে পোড়াবস্তির নারীসহ আটক ছয় ব্যক্তিকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। পরে তারা হাজতখানা থেকে বের হয়ে মিরপুর মডেল থানার প্রধান ফটকে আসেন। এসময় আইন সালিশ কেন্দ্রের (আসক) আইনজীবীরা সেখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তারা হলেন, মো. আজাহার, ইস্কান্দার আলী, নূর ইসলাম, ফিরোজ কামাল ও কুলসুম। সেখানে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ৮ ঘণ্টা হাজত খেটে সদ্য বের হওয়া মো.আজহারের সঙ্গে।
তিনি পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘সকাল ১০ টার দিকে তিনগাড়ি পুলিশ যায়। তারা গিয়ে বস্তির মুরব্বিদের খুঁজতে থাকে। পরে আমি আরও কয়েকজন বয়স্কলোক পুলিশের গাড়ির কাছে আসি। মানিক নামে এক পুলিশ আমাদের জানায়,ওসি সাহেব আমাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। আলোচনার জন্য ডেকেছেন। এরপর আমাদের গাড়িতে করে থানায় নিয়ে আসেন। প্রথমে আমাদের কিছুক্ষণ সেকেন্ড অফিসারের কক্ষে বসান। পরে সবাইকে হাজতের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। এই ৮ ঘণ্টায় আমাদের একবোতল পানিও দেওয়া হয়নি। সন্ধ্যার পর থানার ওসির রুমে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখি এমপি আসলাম বসা। তিনি আমাদের বলেন, ছয়বার বস্তি উচ্ছেদের নির্দেশ এসেছে, আমি ঠেকিয়ে রেখেছি। এবার আর ঠেকাতে পারব না। আপনারা ২১ তারিখের ভেতরে সবাই চলে যাবেন। তা না হলে পুলিশ গিয়ে ভেঙে দেবে।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) আইনজীবীদের সঙ্গে ভুক্তভোগীরা কথা বলার সময় এমপি আসলামের কর্মী পরিচয় দুই যুবক তাদের দ্রুত বাসায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। বারবার তারা তাদের চলে যেতে বলছিলেন। এসময় বস্তিবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা ভয়ে কিছু বলতে চাননি।
আসক আইনজীবী অবন্তি নুরুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘২০০৩ সালে উচ্চ আদালতে একটি মামলা করা হয়, যাতে বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ না করা হয়। এসময় উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উচ্ছেদ না করার জন্য স্থগতি আদেশ দেয়। ২০০৭ সালে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বস্তি উচ্ছেদ না করার জন্য পুনঃরায় আদেশ দেন আদালত। বর্তমানে মামলাটি চলমান রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ওসিকে জানিয়েছি। উচ্চ আদালতের আদেশ রয়েছে।তাদের উচ্ছেদ করা যাবে না। তারপরও যদি উচ্ছেদ করা হয়,তাহলে তা আদালত অবমাননা হবে। ওসি আমাদেরকে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় উচ্ছেদের নির্দেশে দিয়েছে। তবে আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে বস্তি উচ্ছেদ করা যাবে না। আমরা আগামীকাল বিষয়টি আদালতের নজরে পুন:রায় নিয়ে আসব।’
নগর বস্তিবাসীর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি আব্দুস সালাম (শাহআলম) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৮৬ সালে পোড়া বস্তিটিতে মানুষ বসতি তৈরি করে। বর্তমানে সেখানে ৩৫ শ’ ছোটছোট ঘর আছে। নিম্ন ও খেটে খাওয়া ২০ হাজার মানুষ সেখানে বসবাস করেন। জায়গাটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং হাউজ বিল্ডিং রিচার্জ অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বস্তিটি উচ্ছেদের জন্য স্থানীয় এমপি চেষ্টা করছেন। সর্বশেষ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নুরুল আলম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ডিএমপির মিরপুর জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) কায়ুমুজ্জামানের কাছে আসে। সেই চিঠি নিয়ে মিরপুর মডেল থানার ওসি ও এমপি উচ্ছেদের চেষ্টা করছেন। তবে এখানে আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ করা হবে বেআইনি।’
এবিষয়ে মিরপুর মডেল থানার ওসি ভূঁইয়া মাহবুবের সঙ্গে কথা বলার জন্য দফায় দফায় চেষ্টা করা হয়। তিনি মঙ্গলবার রাত ১১ টায় একবার ফোন রিসিভ করে অসুস্থতার কথা বলে ফোন রেখে দেন। তবে মঙ্গলবার রাতে তিনি থানায় ছিলেন। এমপি আসলামের সঙ্গে প্রায় একঘন্টা বৈঠক করেছেন।
ওসির কাছ থেকে এ বিষয়ে জানতে না পেরে মিরপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) তানভীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি সারাদিন স্টেডিয়ামে কমিশনার স্যারের প্রোগ্রামে ছিলাম। আমি বিষয়টি আসলেও ভালো আপনাকে বলতে পারব না। তবে বস্তির উচ্ছেদের একটি বিষয় আছে বলে আমি শুনেছি।’
/এআরআর/ এমএসএম








