প্যাভিলিয়ন শব্দটির আভিধানিক অর্থ- যেখানে বিশ্রাম নেওয়া যায়। আন্তর্জাতিকভাবে বইমেলায় প্যাভিলিয়ন মানে যেখানে নানা কায়দায় বই প্রদর্শন করা হয়, লেখক-পাঠকের যোগাযোগ ঘটে এবং পাঠক স্টলের ভেতর ঢুকে ঘুরে ঘুরে বই দেখেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে হালকা নাশতার ব্যবস্থাও থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বইমেলায় প্যাভিলিয়ন বলে যা বানানো হয়, তার মানে হলো সেটা অন্য স্টলের চেয়ে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন। নামে প্যাভিলিয়ন হলেও দু-একটা প্রকাশনী বাদে কেউই সেটার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে পারেনি।
প্রকাশকরা নিজেরাই সমালোচনা করে বলছেন, প্রকাশকরা প্যাভিলিয়নের জায়গা নেন, কিন্তু এ নিয়ে তাদের জানাশোনা নেই। প্যাভিলিয়ন এমন একটা জায়গা তৈরি করবে, যেখানে পাঠকরা ঢুকবেন, কোনও একটা জায়গায় বসবেন বা লেখকরা থাকলে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। বইমেলা মানে তো কেবল বই বিক্রি করা নয়। এখানে বই সংশ্লিষ্ট যাবতীয় বিষয়ে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ তৈরি হবে লেখক-পাঠক-আয়োজকদের মধ্যে।
আয়োজকরা বলছেন, প্যাভিলিয়িনের কোনও আদর্শ কাঠামো নেই। চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ছেড়ে একটা বড় স্টলকে প্যাভিলিয়ন চিহ্নিত করা হয়। এর কাঠামো প্রকাশক যেমন চান করতে পারেন।
ভিন দেশের বইমেলা
বইমেলার প্যাভিলিয়নের বিশেষত্ব কী জানতে চাওয়া হলে তিনবার ফ্রাঙ্কফুট বইমেলায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শ্রাবণ প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী রবিন আহসান বলেন, বইমেলায় বই বিষয়ক সবকিছু থাকবে। সেখানে বই নিয়ে আলোচনা থাকবে। লেখক পরিচিতি তুলে ধরার ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু বইকে কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি যেসব আলোচনা করে সেগুলো বই নিয়ে নয়, সেগুলো মূলত সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা। আবার আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বইমেলা একমাস থাকাটাও জরুরি। কেননা, আমাদের দেশে বইয়ের দোকান খুব কম। পাঠককে বই পড়ানোর অভ্যাস করানোর তেমন উদ্যোগ নেই। সেক্ষেত্রে পুরো একমাস বিক্রি হওয়াটা প্রকাশকের জন্য জরুরি। বাইরের দেশের বইমেলা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, নতুন বই কী আছে, পাঠকের জন্য কোনটা জরুরি ও ভালো বই কোনটা সেটার সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিকে হবে। নতুন বই মানে আজকে কোনটা এলো সেটা নয়, গত একবছর ধরে কোনটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সেটা। আর প্যাভিলিয়নের নামে যা বানানো হচ্ছে তা হলো চারদিকে খোলা একটা স্টল। যার চতুর্দিক দিয়ে পাঠক ধরার সুযোগ আছে। আর স্টলে শুধু এক পাশেই বিক্রির সুযোগ আছে। সেই বিবেচনায় এবছর ‘পাঠক সমাবেশ’ ছাড়া একটিরও প্যাভিলিয়নের মর্যাদা পাওয়া উচিত নয়।
ভাষাচিত্রের প্রকাশক খন্দকার সোহেল বলেন, আমাদের এখানে বইমেলা হয়ে গেছে বই কেনাবেচার জায়গা। কিন্তু এটা হওয়া উচিত নয়। বইমেলায় প্রকাশক তার সারাবছরের কাজ হাজির করবেন। সেগুলো পাঠকরা ঘুরে ঘুরে দেখবেন। কোনগুলো পড়া দরকার সেটা বিবেচনা করবেন। লেখকের সঙ্গে সাক্ষাতে কথা বলবেন। এসবের কোনোটাই হয় না। প্যাভিলিয়নগুলো আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। প্যাভিলিয়ন হবে এমন যেখানে পাঠক ঘুরে ঘুরে বই দেখবেন। বসে কিছুটা পড়বেন। এখানে যেসব স্টলের চারপাশ খোলা সেগুলোকেই প্যাভিলিয়ন বলা হচ্ছে। চারপাশ দিয়ে বাজারের মতো হল্লা করে বই বেচার চেষ্টা চলে সেখানে।
বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ বলেন, প্যাভিলিয়নের তেমন কোনও সংজ্ঞা নেই। আমাদের এখানে ৩৫ থেকে ৪০টা প্রকাশককে প্যাভিলিয়নের জায়গা দেওয়া হয়। যারা নিজেদের বইয়ের সংখ্যা, মান এবং কাজের উত্তরণ ঘটাতে পেরেছে মনে করেন তারা প্যাভিলিয়নের আবেদন করেন। পরিচালনা কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়। কেন তারা প্যাভিলিয়ন দাবি করে, সেটার প্রমাণ করতে হয়। কমিটি রিভিউ করে। চারদিকে কমপক্ষে ২০ ফুট জায়গা ফাঁকা রাখা হয়। তবে নিজের প্যাভিলিয়ন কীভাবে সাজাবে সেটা প্রকাশকের স্বাধীনতা।









