সাবিনা আকতার পেশায় গৃহিণী। পরিবারের প্রতিদিনের চাহিদার জন্য প্রয়োজনীয় বাজার তিনি করেন। কিন্তু বিগত বেশ কয়েকমাস ধরে বাজার করছেন ঠিকই তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। কেমন পরিমাণ কমিয়েছেন জানতে চাইলে, তিনি জানান প্রায় অর্ধেক। আয়ের সঙ্গে মেলাতে গিয়েই এই সিদ্ধান্ত তার পরিবারের।
অন্যদিকে আহমেদ কবির বাজার থেকে ৩-৪ দিনের জন্য সবজি কিনতে গিয়ে একদিনের সবজি কিনেই ফিরেছেন। তার ভাষ্য- ২ জনের পরিবারের জন্য ২৫০ গ্রাম করে কয়েক পদের সবজি কিনেই ৩০০ টাকার ওপর খরচ হয়ে গেছে। তাই আজকের জন্য আর তিনি আর বাজার করতে আগ্রহ পাননি। তার প্রশ্ন – মধ্যবিত্তদের যদি এই অবস্থা হয় তখন নিম্নআয়ের মানুষরা কিভাবে খাচ্ছে?
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় আকাশছোঁয়ার মতো। বাজারে একমুঠো শাকের দাম সর্বনিম্ন ২০ টাকা, করল্লা ৯০ টাকা, ছোট সাইজের লাউ ৬০ টাকা, ফুল কপি ৪০ টাকা, পাকা টমেটো ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি, শিম ৬০ থেকে ৭০ টাকা, শালগম ৩০ থেকে ৪০ টাকা, বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা, গাজরের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা, মুলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা এবং কাঁচকলার হালি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা।
মাছ কেনার কথা অনেকেই ভাবতে পারেন না। কারণ রুই মাছের কেজি ৩২০ টাকার ওপরে, ছোট মাছের মধ্যে মলা মাছের কেজি ৪০০ টাকা। এসবের পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন – চাল , ডাল, তেল, পেঁয়াজ, মুরগির দাম তো বেশি আছেই। তাছাড়া ডিম কিছুটা এখনও হাতের নাগালেই আছে।
ফলের বাজারেও একই দশা। আনার এক কেজি ২৬০ টাকা, মাল্টা ১৬০ টাকা, আঙ্গুর ২০০ টাকা কেজি, আপেল ১৬০ টাকা। দেশি ফলের দামও অনেকটা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের হাতের নাগালের বাইরে আছে।
জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২৭০ থেকে ৪৫০ গ্রাম চাল, আটা, ভুট্টা গ্রহণ করা উচিত। সঙ্গে ৩০০ থেকে ৬০০ গ্রাম শাকসবজি এবং ১৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম মাছ, মাংস, ডিম খেতে হবে। এছাড়া সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫ মিলি তেল ও চর্বি এবং ৩০ থেকে ৬০ গ্রাম ডাল জাতীয় খাদ্য খেতে হবে। মানুষের দৈহিক ও মানসিক বিকাশের জন্য কেবল ভাত-মাছ হলেই যথেষ্ট নয়। এর সাথে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের খাদ্য তালিকায় দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার দৈনিক ১৫০ থেকে ৪৫০ মিলি, ফলমূল ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম এবং চিনি ১৫ থেকে ২৫ গ্রাম থাকতে হবে।
জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি অনুযায়ী, ১৬ কোটির বেশি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে বাংলাদেশ জটিল কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে থাকে। তার ওপর ২০৩০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ১৮ কোটি ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতসহ কিছু নেতিবাচক প্রবণতা ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন ও টেকসই কৃষির প্রসারে বর্তমানে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এমন আশঙ্কা আছে। এসব প্রবণতার মধ্যে রয়েছে অব্যাহতভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আয় বৈষম্য বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ফলে কৃষি শ্রমিকের সংকট বৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদনশীলতায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি। এছাড়া, নগরায়নের ফলে ভোগ এবং উৎপাদন কেন্দ্রসমূহের পৃথকীকরণ ও দূরত্ব বৃদ্ধির কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর নির্ভরশীলতা এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য প্রাপ্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মধ্যম ও উচ্চ-আয় শ্রেণিভুক্ত পরিবার, যারা তৈরি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্রমবর্ধমান মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং নগরায়নের ফলে পরিবারের খাদ্যতালিকায় কিছু বৈচিত্র্য ঘটছে, তবে তা অনেক ধীর গতিতে। উল্লেখ্য যে, দানাজাতীয় খাদ্যশস্য এখনও মোট খাদ্যশক্তি গ্রহণের ৬০ শতাংশের বেশি দখল করে আছে। জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি সুষম খাবারের ঘাটতিতে রয়েছে; যেখানে ভিটামিন ‘এ’, ক্যালসিয়াম, জিংক এবং আয়রনের অভাব উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ‘অপুষ্টির বোঝা’এড়াতে না পারলে স্থূলতা ও অসংক্রামক রোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ খাদ্য সম্মেলনের আগে ইউনিসেফের প্রকাশিত ‘ফেড টু ফেইল? দ্যা ক্রাইসিস অব চিলড্রেন্স ডায়েটস ইন আর্লি লাইফ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, অসমতা, সংঘাত, জলবায়ু-সংক্রান্ত দুর্যোগ এবং কোভিড-১৯ মহামারির মতো জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্বে সবচেয়ে কমবয়সীদের মাঝে বিদ্যমান পুষ্টি সংকটকে প্রকট করে চলেছে। আর এই ক্ষেত্রে গত দশ বছরে খুব সামান্যই উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে। ইউনিসেফের ওই প্রতিবেদনে যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তার প্রথমেই আছে - উৎপাদন, বিতরণ এবং খুচরা পর্যায়ে বিক্রয়কে উৎসাহিত করার মাধ্যমে ফল, শাকসবজি, ডিম, মাছ, মাংস এবং শক্তিবৃদ্ধিকারী খাবারসহ পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা এবং সহজলভ্যতা বৃদ্ধি করা।
দেশে পুষ্টি নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান)। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জ্যোতি লাল বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দাম অবশ্যই পুষ্টির জোগানে প্রভাব ফেলে। যেখানে আগে মানুষ এক কেজি কিনতো সেখানে ক্রয়ক্ষমতা অনুযায়ী এখন অর্ধেক কিংবা চার ভাগের এক ভাগ কিনে। তাতে তার যে দৈনিক চাহিদা আছে সেটা তো পূরণ করতে পারছে না। এক্ষেত্রে বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখা ছাড়া উপায় হচ্ছে মানুষের আয় বাড়ানো। বাজার মূল্য স্থিতিশীল না করা গেলে মানুষের আয় বাড়াতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে কিন্তু মানুষের তো আয় বাড়ছে না।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, মানুষের যদি ক্রয়ক্ষমতা না থাকে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে সঠিকভাবে খাবার গ্রহণ কমে যায়, পুষ্টি কমে যায়। পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হওয়ার কারণে পেছনে অনেকটা বৈশ্বিক বিষয় কাজ করে। এখন তো যুদ্ধ পরিস্থিতি আছে, বিশ্ববাজারেও জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। এই অবস্থায় সস্তার মধ্যে প্রোটিন আছে ডাল খাওয়া যেতে পারে, শর্করা হিসেবে ভাত, আটা, ময়দা আছে। স্নেহ জাতীয় পদার্থের মধ্যে তেল কম খাওয়া যেতে পারে। ভিটামিনের জন্য দেশীয় ফলমূল যেগুলো আছে সেগুলো খাওয়া যেতে পারে।









