সবাই বইমেলায় এসে মেতেছেন নতুন বইয়ের স্পর্শে। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে বই পড়ে যাচ্ছেন কেউ। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে খোশগল্পে মেতেছেন। কেউবা ছবি তুলছেন। অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এই পাঠকরা বলেন, ‘এভাবে সাহিত্যের বই পড়তে পেরে খুবই ভালো লাগছে। ভাবতেই ভালো লাগছে, বইমেলাটা আমাদেরও।’ বুধবার (২ মার্চ) বাংলা একাডেমির মেলা প্রাঙ্গণে ‘স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা’র স্টলের সামনে ছিল তাদের ভিড়।
বইমেলার চারদিকে নতুন নতুন সহস্র বইয়ের পসরা সাজানো। যেন অসংখ্য ফুটন্ত ফুলের বাগান। পাঠকের দল প্রজাপতির মতো উড়ে এসে নতুন বইয়ের পাতার ওপর ভর করছে। কিন্তু দৃষ্টিহীন পাঠকের জন্য এই সুশোভিত ফুলের বাগানে অসংখ্য ফুলের মাঝে গোলাপের মতো ফুটে উঠেছে ‘স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা’। সাহিত্য অনুরাগী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পাঠকদের জন্যই তাদের এই আয়োজন। ওই পাঠকদের মেলার নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিতে কাজ করতে হুইল চেয়ার সেবা দিচ্ছে ‘সুইচ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’। এ দুই সংগঠনের সহযোগিতায় বইমেলা এখন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদেরও।
রোকসানা কবির লরেন ইউনিভার্সিটি অব ডেভলপমেন্ট অল্টারনেটিভ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বর্তমানে ভিজুয়ালিং পিয়ার পিপল সোসাইটির নির্বাহী সদস্য হিসেবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছেন লরেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমরা মেলায় এসে এভাবে বই পড়তে পেরে খুবই খুশি। আগে আমাদের সমস্যা ছিল, কীভাবে মেলায় আসবো, কীভাবে স্টল খুঁজবো। এখন সেই সমস্যা নেই। এখন আমরা রিকশা থেকে নামলে হুইল চেয়ারে করে আমাদের স্টলে পৌঁছে দেওয়া হয়। আসলে সব মিলিয়ে বিষয়টি আমাদের জন্য এত উপকারী, তা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। এ বইগুলোর অনেক দাম, আমরা কিনতে পারি না। কালি দিয়ে লেখা বইয়ের দাম এক হাজার টাকা হলে ব্রেইল বইয়ের দাম হয় দুই হাজার টাকা। কালি দিয়ে মুদ্রিত এক পৃষ্ঠা আমাদের তিন-চার পৃষ্ঠা হয়ে যেতে পারে। দাম বেশি হয় বলে আমাদের পক্ষে কিনে পড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রতি বছর স্পর্শ আমাদের ফ্রিতে বই দেয়, সেগুলো নিয়ে গিয়ে পড়ি।’
বাপ্পী মো. শাফান খান ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে ডিজঅ্যাবল চাইল্ড ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ করছেন। কলেজে পড়াকালীন তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। মেলায় স্পর্শ ফাউন্ডেশনের স্টলে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ আড্ডায় মেতে ওঠেন। সেখানে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নই, দৃষ্টিজয়ী। আমরা স্পর্শের মাধ্যমে বই পড়ছি। সাধারণত আমরা দৃষ্টিজয়ীরা কালি দিয়ে মুদ্রিত বই পড়তে পারি না, সেই চিন্তা থেকে তিনি (স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনার প্রতিষ্ঠাতা) আমাদের জন্য ব্রেইল বইয়ের মাধ্যমে সাহিত্য পড়ার উদ্যোগ নেন। সাধারণ পাঠকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেন আমরা বই পড়তে পারি, এই চিন্তা থেকে উদ্যোগটা নেওয়া হয়েছে। স্পর্শ ও সুইচ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় সবার সঙ্গে বইমেলার আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারছি, এটা আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
প্রতিষ্ঠাতা নাজিয়া জাবীন বলেন, ‘আমরা একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে “দৃষ্টিজয়ী” বন্ধুরাও এসেছিল। দেখলাম, তারা বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাচ্ছে। অথচ তাদের জন্য কোনও বই নেই। আমরা প্রথম ২০০৯ সালে বই প্রকাশ করি। ২০১১ সালে আমরা বইমেলায় আসি, উদ্দেশ্য অনেক মানুষ জানবে এবং পাশে দাঁড়াবে। মেলায় আসার পর প্রথমে দুটি প্রকাশনী আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এরপর আস্তে আস্তে অনেকে পাশে দাঁড়িয়েছেন। লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও মফিদুল হক বলেছেন তাদের কোনও বই ব্রেইল প্রকাশ করতে অনুমতি লাগবে না। মফিদুল হক প্রকাশের জন্য অর্থও দিলেন। আমার মনে হয় যে, ওদের (দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের) হাতকে আরও শক্ত করা উচিত। বড় বড় প্রকাশনীগুলোর কমপক্ষে একটি ব্রেইল বই প্রকাশ করা উচিত এবং লেখক-প্রকাশকদের আরও বেশি করে এগিয়ে আসা উচিত। সরকারের দিকে না তাকিয়ে প্রত্যেকের নিজ উদ্যোগে করা উচিত।’
সুইচ ফাউন্ডেশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, ‘আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শান্তি হচ্ছে আত্মিক শান্তি। সেই আত্মিক শান্তি মেলে কারও জন্য নিঃস্বার্থভাবে কিছু করতে পারলে। এ ক্ষেত্রে আমি চাই না, নামটাও কেউ জানুক। এখানে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আত্মিক প্রশান্তি। এইটুকু করতে পেরে আমি আনন্দিত। বইমেলাটা তাদেরও করে দিতে আমাদের এই হুইল চেয়ার সেবা।’
সুইচ ফাউন্ডেশনের হুইল চেয়ার সার্ভিসের সমন্বয়ক আকিব জাবেদ বলেন, ‘মেলার দুই প্রান্তে ১৫টি হুইল চেয়ারের মাধ্যমে আমরা প্রত্যেকদিন সেবা প্রদান করে আসছি। কোনও ধরনের বিনিময় ছাড়াই এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মেলার রাস্তা উঁচু-নিচু হওয়ার কারণে আমাদের হুইল চেয়ার নিতে অসুবিধায় পড়তে হয়।’
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে স্পর্শের যাত্রা শুরু। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠাতা নাজিয়া জাবীনের ‘ছড়ার তালে মনটা দোলে’ দিয়ে প্রথম সাহিত্যের ব্রেইল বই প্রকাশ করে এবং ২০১১-এ ব্রেইল বই নিয়ে মেলায় অংশ নেয় সংগঠনটি। ২০১৬-তে সংগঠনটির সহযোগিতায় বাংলা একাডেমি প্রথম ব্রেইল বই প্রকাশ করে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে বইমেলায় সেটির মোড়ক উন্মোচন করেন। বুধবার মোড়ক উন্মোচন হয় শততম ব্রেইল বইয়ের। নাজিয়া জাবীন নিজ অর্থায়নে কাজ শুরু করেন, এরপর একে একে তার স্বামী, মেয়ে, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব এগিয়ে আসেন এই সেবায়।
বইমেলার অন্য খবর
বিকাল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ: রশীদ হায়দার ও ফরহাদ খান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোজাফ্ফর হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন– ইমতিয়ার শামীম এবং মনি হায়দার। সভাপতিত্ব করেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। বুধবার অমর একুশে বইমেলার ১৬তম দিনে নতুন বই এসেছে ১১৪টি।









