ডিএসসিসির সাবেক কর্মকর্তার সম্পদের পাহাড়, অবশেষে দুদকের মামলা

নুরুজ্জামান লাবু
০৬ মার্চ ২০২২, ২১:০০আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২২, ২১:০০

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) চাকরিটা ছিল তার কাছে সোনার হরিণ। ধীরে ধীরে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছিলেন উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। সাবেক মেয়র সাঈদ হোসেন খোকন তাকে বসিয়েছিলেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার পদে। এরপর থেকে যেন রীতিমতো আলাদীনের চেরাগ হাতে পান তিনি। দেশে-বিদেশে গড়ে তোলেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। তার দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা হতো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। কিন্তু কেউ মুখ তুলে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। অ্যাডভোকেট ফজলে নূর তাপস মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাকে চাকরিচ্যুত করেন দর্নীতির অভিযোগে। এবার দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে মামলা করলো।

ডিএসসিসির আলোচিত এই কর্মকর্তার নাম হলো ইউসুফ আলী সরদার। ‘রাজস্বের সরদার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। রবিবার (৬ মার্চ) দুদকের উপ-পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। দুদকের জনসংযোগ শাখার উপ-পরিচালক মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দুদক সূত্র জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর ইউসুফ আলী সরদারের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণীতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন ও দেড় কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের অসঙ্গতিপূর্ণ উৎস দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার সম্পদ বিবরণীতে যেসব অসঙ্গতি পাওয়া গেছে সেসব মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বিস্তারিত তদন্ত করা হবে। বিস্তারিত তদন্তে আরও সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলে তা চার্জশিটে যোগ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইউসুফ আলী সরদারকে নগর ভবনের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ হিসেবে সবাই চিনত। সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন বিভিন্ন মার্কেট ও বিপণীবিতানে দোকান বরাদ্দ ও বিক্রির নামে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ডিএসসিসির এলইডি বিজ্ঞাপনের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ইউসুফ আলী সরদার ছিলেন মেয়র সাঈদ খোকনের ডান হাত। পুরো নগর ভবনই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। রাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে, কেনাকাটা, নতুন হোল্ডিং নম্বর ইস্যু, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, রিকশা-ভ্যানের লাইসেন্স ইস্যুসহ নগর ভবনের পদোন্নতি ও পদায়ন সবকিছুই তিনি একহাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন। এভাবেই তিনি অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ১৭ মে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান ও প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদারকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি দুদকের পক্ষ থেকে ইউসুফ আলীর কাছে সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে বলা হয় ইউসুফ আলী সরদারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎপূর্বক শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এজন্যই তাকে ও তার স্ত্রী শাহিদা আক্তার ও তার ওপর নির্ভরশীলদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব ও বৈধ উৎস জানাতে বলা হয়।

দুদক সূত্র জানায়, গত বছরের ৩ জুন ইউসুফ আলী সরদার দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে জমি ও প্লট ক্রয়ে ৫৮ লাখ ৪২ হাজার ৯০০ টাকা মূল্যমানের স্থাবর সম্পদ এবং উপহার হিসেবে প্রাপ্ত স্বর্ণালংকার ব্যতিত ব্যাংক স্থিতি, আশা সমিতিতে স্থিতি, আসবাবপত্র ক্রয়, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ক্রয়, অন্যন্যা বিনিয়োগ এবং হাতে নগদ ও অন্যান্যসহ মোট ১ কোটি ৭৩ লাখ ৯১ হাজার ৭৯৯ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের ঘোষণা দেন। কিন্তু তার সম্পদ বিবরণী যাচাই ও অনুসন্ধানকালে পাবনা সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, তার নামে বাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদ ছাড়াও জমি ক্রয়, প্লট ক্রয় এবং নিজে ক্রয়কৃত জমি ভাইকে হেবামূলে দানসহ ১ কোটি ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৮৩ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। এছাড়া উপহার হিসেবে প্রাপ্ত স্বর্ণালংকার ছাড়া ব্যাংক স্থিতি, আশা সমিতিতে স্থিতি, আসবাবপত্র ক্রয়, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ক্রয়, অন্যন্যা বিনিয়োগ এবং হাতে নগদ ও অন্যান্যসহ মোট ১ কোটি ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৮৯৯ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদসহ সর্বমোট ২ কোটি ১৭ লাখ ২ সহাজার ৫৮২ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদক সূত্র জানায়, ইউসুফ আলী সরদারের অবৈধ সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানের সময় তার আয়কর নথি পর্যালোচনা করে ১৯৯৯-০০ থেকে ২০১৮-১৯ করবর্ষ পর্যন্ত পারিবারিক ব্যয় পাওয়া যায় ১   কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার ৮৮০ টাকা। ব্যয়সহ তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬৩ টাকা। এর বিপরীতে ইউসুফ আলী সরদারের বেতন-ভাতাদি হতে আয়, ব্যাংক সুদ হতে আয়, কৃষি ও মৎস্য থেকে আয়, কর অব্যাহতি ও করমুক্ত আয় এবং স্বর্ণ বিক্রয় থেকে আয়সহ মোট ১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৪ লাখ ৪২৯ টাকার আয়ের উৎস পাওয়া যায়। তিনি সম্পদের তথ্য গোপন করা ছাড়াও অবৈধ উপায়ে তিনি বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইউসুফ আলী সরদারের উত্থান শুরু হয় বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের আমলে। পরবর্তীতে মির্জা আব্বাস পূর্তমন্ত্রী থাকার সময় তিনি পূর্বাচলে সাড়ে সাত কাঠার একটি প্লটও নিজের নামে বরাদ্দ নিয়েছেন। অবৈধভাবে উপার্জিত তার অর্থের বেশিরভাগই তিনি হুন্ডির মাধ্যমে কানাডায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। ২০১০ সাল থেকে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা কানাডায় বসবাস শুরু করেন। ইউসুফ আলী সরদারকে কানাডার প্রবাসী বাঙালীরা ব্যবসায়ী হিসেবে চেনে। কানাডার রাজধানী টরেন্টোর ড্যানফোর্থের পাশে তিনি বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন।

দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, ইউসুফ আলী সরদারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে যদি বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া যায়, সেসবও আমলে নিয়ে চার্জশিটে যোগদান করা হবে।

/এমআর/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক