‘প্রকাশ্যে ঘুরছে’ তিন খুন মামলার সাজাপ্রাপ্ত ২ আসামি

আমানুর রহমান রনি
০১ মে ২০২২, ১৬:০৯আপডেট : ০১ মে ২০২২, ১৬:০৯

প্রায় ২০ বছর আগে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের রাজবল্লভপুর গ্রামে একই পরিবারের তিন সদস্যকে খুনের ঘটনা ঘটে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ২০ বছর পার হলেও ওই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামি রয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সর্বোচ্চ আদালতে সাজা নিশ্চিত হওয়ার পর গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, দুই আসামিকে ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’। অথচ তারা এলাকাতেই নির্বিঘ্নে বসবাস করছে, জামিন নেওয়ারও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীর আইনজীবী।

২০০২ সালের ২০ নভেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের রাজবল্লভপুর গ্রামে চাঞ্চল্যকর মা ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনা ঘটে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আব্দুল করিমের ভাইয়েরা তার স্ত্রী শামীমা ইয়াসমিন শাহানাকে পিটিয়ে হত্যা করে। আর তার দুই সন্তানকে আব্দুল করিম নিজেই আছরে ও পিটিয়ে হত্যা করে।

এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। চার বছর মামলাটি বিচার কার্যক্রম শেষে ২০০৬ সালে দ্রুত বিচার ট্র্যাইবুন্যালের বিচারক সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল করিমের মৃত্যুদন্ড, তার ভাই আবু বকর ও আব্দুস শুক্কুরকে যাবজ্জীবন সাজা দেন। অপর দুই আসামি আব্দুল করিমের চাচাতো ভাই আব্দুল খালেক ও মাহাবুবুল হককে খালাস দেন।

২০১১ সালের ৭ জুন আসামিপক্ষ হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত করিমের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। আব্দুল শুক্কুর পলাতক থাকায় তার সাজা যাবজ্জীবন বহাল রাখা হয় ও আবু বকরকে খালাস দেওয়া হয়।

২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিলে খালাসপ্রাপ্ত আবু বক্করের খালাসের রায়ও বাতিল করে এক মাসের মধ্যে তাদের চট্টগ্রাম দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে আত্মসমর্পণের নির্দেশ প্রদান করেন। আসামিরা বিগত ৮ বছরেও আত্মসমর্পণ না করায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। গ্রেফতারি পরোয়ানা স্থানীয় চৌদ্দগ্রাম থানায় পাঠানো হলে পুলিশ আসামিদের পলাতক দেখিয়ে আদালতে পরোয়ানার জবাব দেয়। পরে ওয়ারেন্ট ফেরত পাঠায় চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ।

নিহত শামীমা ইয়াসমিন শাহানার পরিবার উচ্চ আদালতে মামলাটি পরিচালনার জন্য অ্যাডভোকেট আবিদ হোসেনকে আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে খালাসপ্রাপ্ত আসামি আবু বক্করের উচ্চ আদালতের দেওয়া খালাসের আদেশ বাদ দিয়েছে। তাকে বিচারিক আদালতে হাজির হতে বলছে। পলাতক শুক্কুরকেও চট্টগ্রামের বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে বলেছে। আপিল বিভাগের আদেশ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। এক মাসের মধ্যে তাদের দ্রুত বিচার ট্রাব্যুনালে তাদের হাজিরা হওয়ার কথা। তবে তারা আট বছরেও কেউ সেখানে হাজির হয়নি। এলাকায় তারা তথ্য ছড়িয়েছে তারা উচ্চ আদালত থেকে খালাস পেয়েছে। আসলে তারা কেউ খালাস পায়নি। তারা আদালতে হাজির না হওয়াতে তাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না।’

আসামিদের গ্রেফতার না করার বিষয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শুভরঞ্জন চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে বর্তমানে কোনও পরোয়ানা নেই। আমাদের কাছে ২০১৪ সালে একটি পরোয়ানা ছিল, সেটি আমরা ২০১৭ সালে ফেরত পাঠিয়েছি। এরপর আর কোনও পরোয়ানা আসেনি। পরোয়ানা না থাকলে আমরা কাউকে গ্রেফতার করতে পারি না।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি আইয়ুব খান এবিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসামিদের আদালতে হাজির হতেই হবে। এছাড়া উপায় নেই। আদালতে না এসে কেউ জামিন নিতে পারবে না। এরকম সুযোগ নেই।’

যেভাবে মা ও দুই সন্তানকে হত্যা

সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল করিম খুলনায় চাকরি করার সময় ১৯৮৯ সালে শামীমা ইয়াসমিন শাহানাকে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেন। তবে তার মা-বাবা ও ভাইয়েরা এ বিয়ে মেনে নেয়নি। চাকরিকালীন তিনি বিভিন্ন জায়গায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তবে অবসরের পর তিনি দুই সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে চলে যান। এতে করে তাদের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়াও হতো।

২০০২ সালের ২০ নভেম্বর পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে আব্দুল করিম ও স্ত্রী শাহানাকে তার ভাই আবু বকর, আবদুর শুকুর, তার মা তনজেবেরনেসা ও চাচাতো ভাই আব্দুল খালেক ও  মাহবুবুল হক মারধর করে। তাদের হামলা থেকে বাঁচাতে করিম দুই সন্তানসহ ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। ঘরের বাইরে থাকা তার স্ত্রীকে ব্যাপক মারধর করে উল্লেখিতরা। শাহানার আর্তচিৎকারে করিম বাইরে এসে দেখে শাহানা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে।

আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে আব্দুল করিম বলেছেন, ‘স্ত্রীর মৃত্যুতে সে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে নিজের মেয়ে নাসরিন সুলতানা শিরীন (১২) ও ছেলে শাহরিয়ার শাকিবকে (৫) লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ও আছরে হত্যা করে।’

এ খবর পেয়ে থানা পুলিশ তিন জনের মৃতদেহ উদ্ধার ও করিমকে আটক করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় পুলিশের এসআই দিলীপ কুমার বার্মা বাদী হয়ে ঘটনায় জড়িত থাকায় আব্দুল করিম, তার আপন দুই ভাই আবু বকর ও আব্দুর শুক্কুর, মাহবুবুল হক, মা তনজবেরনেসা ও চাচাতো ভাই আব্দুল খালেককে আসামি করে মামলা করেন।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম