রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আসামি ধরতে গিয়ে মারধর ও হেনস্তা করার অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি ওয়ারী বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন) কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এই প্রমাণ পেয়েছে। তবে তদন্ত কমিটিকে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা তথ্য দেওয়ার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, গত ৮ এপ্রিল যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচার ৪ নম্বর গেটের একটি বাসায় আসামি ধরতে গিয়ে ওই পরিবারের সদস্যদের মারধরসহ নির্যাতন করে পুলিশের তিন জন সদস্য। সিসিটিভি ফুটেজে মারধরের সত্যতা পাওয়া গেলে সেই তিন পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তকৃতরা হলেন— যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বিশ্বজিৎ সরকার, কনস্টেবল শওকত আলী ও নারী কনস্টেবল নবনীতা বনসেন। এ ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ করে আনসার সদস্য সুমন দেবকে নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কী কারণে এ ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে, তা তদন্তে গঠিত কমিটিও হেনস্তার প্রমাণ পায়।
এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা মঙ্গলবার (১০ মে) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হেনস্তার বিষয় সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেখানে দায়িত্বরত এসআই বিশ্বজিৎ তার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন। তিনি উপস্থিত থাকার পরও নারী কনস্টেবল নবনীতা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন এবং ভুক্তভোগীদের শরীরে হাত তোলেন। এটা পুলিশ সদস্য হিসেবে অপেশাদার আচরণের বহিঃপ্রকাশ। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রাথমিকভাবে এসব তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, এরই মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন ডিসি ওয়ারীর কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি বিধি মোতাবেক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপির ডিসিপ্লিন শাখার ডিসির কাছে পাঠাবেন। এরপর ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্স এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারটি এ ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে অনেকটাই অসহযোগিতামূলক আচরণ করেছে। বেশ কয়েকবার চিঠি দিয়ে ডাকা হলেও তারা আসেনি। এ ঘটনার পেছনে অন্য কিছু আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ ইফতেখার আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবেদন হাতে পাওয়া গেছে। তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। ডিএমপি সদর দফতর পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে। তবে প্রাথমিকভাবে তিন পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’ আসামি ধরতে গিয়ে এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কোনও পুলিশ সদস্যদের কাছে কাম্য নয় বলেও জানান তিনি। বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্যদের রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।
এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য খায়ের মোল্লার মেয়ে শিল্পী আক্তার বলেন, ‘ওই ঘটনার পর থেকে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। কখন কী ঘটে যায়, এ শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছি। এ ঘটনার সংবাদ যখন প্রকাশিত হয়, তারপর পাশের বাসার মালিক তিন ফুট দেয়াল ভেঙে দেয়। আমরা সেখান থেকে যাতায়াত করছি।’
প্রতিবেশী হাজি নুরুল ইসলাম স্যুয়ারেজ লাইনের সংযোগ এখনও দিচ্ছেন না বলেও দাবি করেন খায়ের মোল্লার মেয়ে শিল্পী আক্তার।
তদন্ত কমিটির কাছে তাদের জবানবন্দি না দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছি পুলিশ এসে আমাদের বাসায় জবানবন্দি নিয়ে যাবে। তারা আমাদের ওয়ারী বিভাগের পুলিশের কার্যালয়ে ডেকে ছিল, আমরা সেখানে যাইনি।’ তবে সিসিটিভির পুরো সাড়ে সাত মিনিটের ফুটেজ পুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
উল্লেখ্য, যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচা এলাকায় দুই প্রতিবেশী হাজী নুরুল ইসলাম ও খায়ের মোল্লার পরিবারের মধ্যে জমিজমা নিয়ে আগে থেকে বিরোধ ছিল। এই বিরোধের জেরে গত ৮ এপ্রিল খায়ের মোল্লার বাসার বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেওয়া হয়। এরপর ৯৯৯ নম্বরে ফোন করা হলে পুলিশ গিয়ে আসামি না ধরে ভুক্তভোগীদের মারধর করে।









