১০-১২ জনের একটি দল। সবার বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। দিনে তারা ভিন্ন ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকে। কেউ সিএনজি চালায়, কেউ আবার মুদি দোকানে কাজ করে। ডেলিভারি ম্যান হিসেবেও কাজ করে একজন। আরেকজন দিনে রঙমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু রাত হলেই তারা একত্রিত হয়ে যায় অভিন্ন উদ্দেশ্যে। তা হলো ডাকাতি। আগে থেকেই টার্গেট করে রাখা বাসায় গিয়ে হানা দেয় তারা। তাদের টার্গেট হলো ঢাকার আশপাশের এলাকায় প্রবাসীদের বাড়ি। এক রাতে অন্তত দুটি বাড়িতে ডাকাতি করার পরিকল্পনা নিয়ে বের হতো তারা।
সোমবার (৩০ মে) রাতে মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকা থেকে দুর্ধর্ষ এই ডাকাত চক্রকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিম। তাদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলো, সুজন হাওলাদার, রবিউল আউয়াল ওরফে রবি, বাবু, রনি, একরাম আলী ও ইব্রাহীম। গ্রেফতারকৃতদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত শুনানি শেষে একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহাদত হোসেন সুমা জানান, এই ডাকাত চক্রটি সিএনজি ও পিকাপ নিয়ে ঢাকার আশপাশে বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি করে বেড়াতো। বয়সে তরুণ হলেও এরা অনেক বেশি হিংস্র। ডাকাতি করতে গিয়ে এরা গুলি চালাতেও দ্বিধা করে না। এই দলের সদস্যরা কেরানীগঞ্জের এক বাসায় ডাকাতি করতে গিয়ে বাধা পেয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করলে বেশ কয়েকজন আহত হন।
গোয়েন্দা পুলিশের একই কর্মকর্তা জানান, এই গ্রুপের এক দলনেতা এখনও পলাতক। সে পেশায় সিএনজি চালক। সিএনজি চালানোর আড়ালে সে রাতে ডাকাতি করে বেড়ায়। তাকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ডাকাত দলের এই চক্রটি ঢাকার চারপাশের বিভিন্ন এলাকার প্রবাসী ও ধনী ব্যক্তিদের বসতবাড়ি টার্গেট করে ডাকাতি করে। দিনের বেলা বিভিন্ন অজুহাতে প্রথমে টার্গেটকৃত বসতবাড়ি রেকি করে আসে। পরে রাতে দলবদ্ধভাবে ডাকাতি করতে যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হওয়া সুজন ও ইব্রাহীম জানিয়েছে, দলনেতার নির্দেশে তারা হাজারীবাগ বা মোহাম্মদপুর এলাকার কোনও এক জায়গায় একত্রিত হয়ে টার্গেটকৃত বসতবাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে সবাই নিজেদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে ফেলে। পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য ভিন্ন নামে তোলা মোবাইল সিম ব্যবহার করে। ডাকাতির পরপরই সেসব সিম বন্ধ করে দেয়, যাতে ডাকাতির পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোবাইল ট্র্যাকিং করে তাদের শনাক্ত করতে না পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই মাসে রাজধানীর উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ এলাকায় অর্ধশত ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। কেরানীগঞ্জেই এক মাসে অন্তত আটটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। গ্রেফতারকৃতরা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ধামরাইয়ের কুশুড়া টোপেরবাড়ী এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক রাষ্টদূত সোহরাব হোসেনের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনাটি স্বীকার করেছে।
গ্রেফতারকৃত ইব্রাহীম জানিয়েছে, তারা একই রাতে ধামরাই এলাকার দুটি বাড়িতে ডাকাতির পরিকল্পনা করেছিল। প্রথমে একটি বাড়িতে ডাকাতি করতে গেলে লোকজন টের পেয়ে চিৎকার করতে থাকেন। তখন ওই বাড়ি থেকে দ্রুত বের হয়ে পাশের গলিতে রাখা সিএনজি নিয়ে সটকে পড়েন। পরে তারা সাবেক রাষ্ট্রদূত সোহরাবের বাসায় ডাকাতি করতে ঢোকেন।
পুলিশ জানায়, গত ২৫ এপ্রিল মধ্যরাতে কেরানীগঞ্জের ঘোষকান্দা গ্রামের বাসিন্দা সানাউল্লাহ মিয়ার বাড়িতে একদল ডাকাত হানা দেয়। এ সময় বাধা দেওয়ায় ডাকাত সদস্যদের গুলিতে অন্তত ১০ জন আহত হন। ডাকাতদের আঘাতে এক স্কুলছাত্র দীর্ঘদিন অচেতন অবস্থায় রাজধানীর একটি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিল। প্রবাসী সানাউল্লাহর বাড়িতে হানা দেওয়ার আগে ইসলাম মিয়া নামে আরেক ব্যক্তির বাড়িতে হানা দিয়ে সাত লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় ডাকাত দলটি।
গ্রেফতার হওয়া সুজন হাওলাদার জানায়, তারা কেরানীগঞ্জের ইসলাম মিয়ার বাড়িতে ডাকাতির পর মালামাল নিয়ে নিজেদের সিএনজিতে রাখে। এরপর তারা হানা দেয় সানাউল্লাহর বাড়িতে। প্রাচীর টপকে ওই বাসায় ঢোকার পরপরই লোকজন টের পেয়ে চিৎকার শুরু করে। এ সময় সুজন তার সঙ্গে থাকা অস্ত্র দিয়ে গুলি করতে থাকে। পরে দ্রুত ওই বাসা থেকে বের হয়ে তারা সিএনজি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।
গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতারকৃত ডাকাত দলের সদস্যরা সবাই স্বল্প শিক্ষিত। তারপরেও তারা তথ্য-প্রযুক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কোনও বাসায় ডাকাতি করার আগে সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নেয়। ডাকাতি শেষে তারা সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিআর খুলে নিয়ে যায়। এই গ্রুপের অপর সদস্যদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।









