X
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২
১৬ আষাঢ় ১৪২৯

দাওয়াতে বাসায় ডেকে নিয়ে ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা

আপডেট : ২৪ জুন ২০২২, ০১:৩৪

আপেল ও শের আলী প্রায় চার বছর ধরে ইরাকের আল মনসুর এলাকার একটি হোটেলে একসঙ্গে কাজ করেন। শের আলীকে নাহিদ নামে পরিচিত এক তরুণ তার বাসায় দেশীয় খাবার রান্না হবে জানিয়ে দাওয়াত দিয়েছিল। শের আলীর সঙ্গে আপেলও যেতে রাজি হয়। তাদের একটি গাড়িতে করে নিয়ে যায় নাহিদ। কিন্তু সেই যাত্রাই কাল হয়েছিল তাদের।

গাড়িতে ওঠার পরপরই নাহিদ ও তার সহযোগীরা অর্থের লোভে আপেল ও শের আলীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। তাদের হাত ও মুখ বেঁধে বাসায় নিয়ে চলতে থাকে নির্যাতন। সেই ভিডিও ইমো অ্যাপের মাধ্যমে আপেল ও শের আলীর পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে তারা। দুই পরিবারের সদস্যরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে নাহিদের বাংলাদেশি এজেন্টের কাছে এক লাখ টাকা করে দেয়। তারপরও বাকি টাকার জন্য আপেল ও শের আলীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে আপেলের পরিবারের সদস্যরা সহযোগিতা চেয়ে সব জানালে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ইকোনমিক ক্রাইম অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং বিভাগ সন্ত্রাসী চক্রটির দুই সদস্যকে গ্রেফতার করে। এছাড়া ইরাকে থাকা চক্রটির পরিবারের সদস্যদের পরিচয় বের করে তাদের চাপ দিয়ে আপেল ও শের আলীসহ সাত জনকে বন্দিদশা থেকে ছাড়িয়ে এনেছে।

সিটিটিসি ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর তারা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিকাশে এক লাখ টাকা নেওয়া নাহিদের বাংলাদেশি এজেন্টকে খুঁজে বের করেন। সেই সূত্রে ইমরান ও আলমগীর নামে দুই জনকে আটক করা হয়। একইসঙ্গে ইরাকে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি চক্রটির পরিবারের সদস্যদের তারা চাপ দেওয়ায় আপেল ও শের আলীসহ সাত জন জিম্মি অবস্থা থেকে মুক্ত হয়েছেন।

আটক আলমগীর ও ইমরান

ইরাক প্রবাসী আপেল এই প্রতিবেদককে জানান, তার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানাধীন বিনোদপুরে। বছর চারেক আগে ইরাকে কাজ করতে যান তিনি। বাগদাদের কাছে আবু জাফর আল মনসুর শহরের একটি কাবাব রেস্তোরাঁয় তার সঙ্গে গাইবান্ধার বাসিন্দা শের আলীও কাজ করে। শের আলীর সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি নাহিদের পরিচয় ছিল। গত ১৪ জুন শের আলীকে বাসায় দেশীয় খাবার রান্না হবে বলে দাওয়াত দেয় নাহিদ। আপেলকে নিয়ে নাহিদের বাসায় যেতে রাজি হয় শের আলী। সেদিন সকালে তারা গাড়িতে ওঠা মাত্রই অস্ত্রের মুখে তাদের জিম্মি করে ফেলে নাহিদ। দুই জনকে হাত-পা ও মুখ বেঁধে সে নিজের বাসায় নিয়ে যায়। তখন নাহিদের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি শফিকুল, মাহফুজ ও শিহাব ছিল। বাসায় নেওয়ার পর লোহার রড দিয়ে তাদের বেধড়ক মারতে থাকে নাহিদ ও তার সহযোগীরা। এরপর তারা পাঁচ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করে।

আপেল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তিনি কান্নাকাটি করে অপহরণকারী চক্রের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চান। কিন্তু তারা সাফ জানিয়ে দেয়, টাকা ছাড়া মুক্তি মিলবে না। টাকার জন্য তারা চাকু দিয়ে আপেল ও শের আলীর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় খোঁচাতে শুরু করে। একপর্যায়ে ভাত খাওয়ার চামচ ও খুন্তি গরম করে দুই জনের শরীরে ছ্যাঁকা দেয়। সহ্য করতে না পেরে দেশে থাকা স্ত্রী শিল্পীর ইমো নম্বরে ফোন করে টাকার ব্যবস্থা করতে বলেন আপেল। অপহরণকারীরা তার স্ত্রীকে ভিডিও কলে রেখে নির্যাতন চালাতে থাকে। পরে পরিবারের সদস্যরা টাকা দিতে রাজি হয়ে একটু সময় চেয়ে নেয়। সেদিনই বিকালে টাকা জোগাড় করে অপহরণকারীদের দেওয়া এজেন্ট নম্বরে এক লাখ টাকা পাঠান তারা। তারপরও মুক্তি না দিয়ে বাকি টাকার জন্য নির্যাতন করতে থাকে প্রবাসী অপরাধী চক্র। আপেল তখন নাহিদের বাসায় শেকল দিয়ে বাঁধা আরও পাঁচ-সাত জনকে দেখেন।

(বাঁ থেকে) প্রবাসী আপেল, বাবলু ও শের আলী

সিটিটিসি ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাটি জানতে পেরে অপহরণকারী চক্রের বাংলাদেশি সদস্যকে ধরতে ফাঁদ পাতেন তারা। বাকি টাকা নিতে বাংলাদেশি এজেন্ট মতিঝিল এলাকায় এলে গত ২০ জুন ইমরান নামের ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আলমগীর নামে আরেকজনকে গ্রেফতার করা হয়। আলমগীরের বিকাশ এজেন্ট নম্বর দিয়ে অপরাধী চক্র মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ করতো।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইমরানকে গ্রেফতারের পর ইরাকে থাকা তার সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে সিটিটিসি ইউনিট। কিন্তু ইরাকে থাকা ইমরানের সহযোগীরা কোনোভাবেই আপেল ও শের আলীকে মুক্তি দিচ্ছিল না। পরবর্তী সময়ে ইমরানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপহরণকারী চক্রের সদস্য নাহিদ, শফিকুল ও শিহাবের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করা হয়। পরিবার তিনটির সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানালে তিন অপরাধী গত ২১ জুন আপেল ও শের আলীসহ সাত জনকে জিম্মি অবস্থা থেকে ছেড়ে দেয়।

কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, চাপের মুখে অপহরণকারীরা আপেল ও শের আলীসহ রংপুরের পীরগাছার বাবুল, চাঁদপুর মতলবের মারুফ, কুষ্টিয়ার মজলু, রহমান, জিহাদ ও ফয়সাল নামে সাত জনকে মুক্তি দিয়েছে। এরমধ্যে ইরাকে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তারা শের আলী, আপেল ও বাবুলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। বাকিদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।

অপহরণকারীরাও প্রবাসী বাংলাদেশি
সিটিটিসি কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ইরাকে মুক্তিপণের জন্য অপহরণকারী চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছে প্রবাসী একজন বাংলাদেশি। তার নাম শিহাব। তার নামে বাংলাদেশে মানবপাচার আইনে মামলা রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার কালুখালী মাঝিবাড়ি এলাকার কয়ারদিতে। তার বাবার নাম বাবুল মণ্ডল। শিহাবের অন্যতম প্রধান সহযোগী নাহিদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থানাধীন কেশবপুর এলাকায়। তার বাবার নাম গিয়াস উদ্দিন। অপহরণকারী চক্রের অপর সদস্য শফিকুলের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব থানাধীন মোহনপুর শেখপাড়ায়। তার বাবার নাম আকতার শেখ।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, চক্রটির সদস্যদের সঙ্গে কিছু পাকিস্তানি ও ইরাকি নাগরিক মিলে সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশিদের ধরেবেঁধে মুক্তিপণ আদায় করে। তারা পেশাদার অপরাধী চক্র। বিদেশে গিয়ে কাজ না করে তারা নিয়মিত অপহরণের মাধ্যমে অর্থ আয় করে। চক্রটির বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনের আওতায় আনতে তাদের পাসপোর্ট নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য পুলিশের এনসিবি শাখার মাধ্যমে ইরাকি পুলিশের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

/জেএইচ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শেষ হলো বাজেট অধিবেশন
শেষ হলো বাজেট অধিবেশন
এক কাউন্সিলরের মামলায় আরেক কাউন্সিলরের জেল ও জরিমানা
এক কাউন্সিলরের মামলায় আরেক কাউন্সিলরের জেল ও জরিমানা
স্ন্যাক আইল্যান্ডে ইউক্রেনের ‘বড় জয়’ কি যুদ্ধের টানিং পয়েন্ট?
স্ন্যাক আইল্যান্ডে ইউক্রেনের ‘বড় জয়’ কি যুদ্ধের টানিং পয়েন্ট?
গাছে ঝুলছিল যুবকের মরদেহ
গাছে ঝুলছিল যুবকের মরদেহ
এ বিভাগের সর্বশেষ
মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুকদের সতর্ক করলো সরকার
মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুকদের সতর্ক করলো সরকার
‘মালয়েশিয়ায় সিন্ডিকেট হলে অন্য শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলবে’
‘মালয়েশিয়ায় সিন্ডিকেট হলে অন্য শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলবে’
দাম্মাম থেকে শেষ ফোন মাকে, ২০ দিন খোঁজ নেই মামুনের
দাম্মাম থেকে শেষ ফোন মাকে, ২০ দিন খোঁজ নেই মামুনের
প্রবাসীদের সেবা সহজ করতে নানামুখী উদ্যোগ দুবাই কনস্যুলেটের
প্রবাসীদের সেবা সহজ করতে নানামুখী উদ্যোগ দুবাই কনস্যুলেটের
দেশের পথে লিবিয়ায় আটক ১৬০ বাংলাদেশি
দেশের পথে লিবিয়ায় আটক ১৬০ বাংলাদেশি