ঈদের দিনও জীবিকার তাগিদে ‘কালেকশনে’ ট্রান্সজেন্ডাররা

মাহফুজ সাদি
১০ জুলাই ২০২২, ২০:৫৯আপডেট : ১০ জুলাই ২০২২, ২১:৪৪

‘ভাই-বোনদের মতোই পরিবারের সবার আদর-স্নেহে বড় হয়েছি। একটা পর্যায়ে মনো-দৈহিক ভিন্নতা প্রকাশ পেলে তাদের আচরণ বদলে যায়। স্কুলের সহপাঠী থেকে শুরু করে প্রতিবেশী- সবাই আড়চোখে তাকাতে শুরু করে। নানা ধরনের বুলিংয়ের শিকার হতে হয়! বাধ্য হয়ে ঘর ছাড়তে হলো। কোথাও ঠাঁই না পেয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি। এখন ঈদের দিনেও জীবিকার তাগিদে কালেকশনে নামতে হয়েছে।’ রবিবার (১০ জুলাই) সকালে মহাখালীর ওয়্যারলেস এলাকায় রাস্তার পাশের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সরাবান তহুরা সারা যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন দুচোখ ছিল ছলছল। তিনি বাংলাদেশে নিজের ধারণ করা নাম-পরিচয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া প্রথম কোনও ট্রান্সজেন্ডার।

সরাবান তহুরা সারা

বর্তমানে প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটিতে ইন্টারন্যাশনাল টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগে পড়াশোনা করছেন সারা। নিজ খরচে এগিয়ে চলা এই মানুষটি আগামীতে পিএইচডি করে সাইকোলজি নিয়ে কাজ করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

সারা নিজে উদ্যোগী হয়ে সাপোর্ট হিউম্যান অ্যান্ড সাপোর্ট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এটি নিয়ে নিজ জনগোষ্ঠীর মানুষকে আইনি ও শিক্ষা সহায়তাসহ অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর চেষ্টা করছেন।

জন্মস্থান ও পরিবারের তথ্য জানাতে অসম্মতি জানালেও সারা বলেন, ‘ঘর ও এলাকাছাড়া হওয়ার পর হিজড়াদের সঙ্গে যোগ দিলাম। তারা আমাকে গ্রহণ করলো। নিয়ে গেলো দলনেতা একজনের কাছে। তার কাছে আশ্রয় পেলাম। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলো। মা-বাবা, ভাই-বোনের প্রতি মন টানলেও আর যাওয়া হলো না। থেকে গেলাম ওদের সঙ্গে। তারপর ওদের সঙ্গে উপার্জন করতে রাস্তায় নামলাম। খেয়ে-পরে তো বাঁচতে হবে।’

এদিন ঈদের কালেকশনে অন্য চারজনের সঙ্গে কথা হয়, তাদের জীবনের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই বলে জানা গেলো। তারা সবাই ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর। সবার জীবনের শুরুর দিকের গল্পগুলোও একই। এখন তারা দলবেঁধে মহাখালী এলাকার বিভিন্ন দোকান, পথচারী এবং গাড়িতে সাহায্য চেয়ে মানুষের কাছে হাত পাতেন।

শুভা আকন্দ

ইউনিলিভার বাংলাদেশের কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে কাজ করছেন ট্রান্সজেন্ডার শুভা আকন্দ। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলার ঈদের মতো এখন আর ঈদ হয় না। ঈদের চাঁদটা যেন উপহাস করছে আমাদের সঙ্গে, এখন এমনটাই মনে হয়। তারপরও নিজ কমিউনিটির বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। ঘুরতে গেলেও বিড়ম্বনায় পরতে হয়। নানা ধরনের মানসিক, শারীরিক হয়রানির শিকার হতে হয়।’

নিজ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার তাগিদ দিয়ে শুভা বলেন, ‘আমাদের জন্য কুটিরশিল্পসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে অবস্থার উন্নতি হবে। সরকারের উচিত এদিকে নজর দেওয়া।’

একই ধরনের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন। গত ২৬ জুন রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তারা। তাদের বক্তব্যে ট্রান্সজেন্ডাদের জীবনে পদে পদে বৈষম্য আর বঞ্চনার করুণ চিত্র উঠে এসেছে।

তাদেরই একজন পার্বতী আহমেদ। তিনি বলেন, ‘হিজড়া কিনা তা পরীক্ষা করাতে হাসপাতালে নেওয়া হলে কিংবা চিকিৎসার জন্য গেলেও সমস্যায় পড়তে হয়। পুরুষের লাইনে নাকি নারীদের লাইনে দাঁড়াতে হবে, টিকিটে লিঙ্গ হিসেবে পুরুষ নাকি নারী লিখতে হবে, হিজড়ার পরীক্ষা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকা, সংশ্লিষ্টদের এড়িয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে– এমনকি সঠিক চিকিৎসার অভাবে অপমৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।’

খুলনা থেকে আসা পাখি দত্ত বলেন, ‘আমি একটি এনজিওতে চাকরি করছি। তা না হলে রাস্তায় নামতে হতো। সরকার আমাদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমাদের চাকরির ব্যবস্থা করা হলে কাউকে রাস্তায় নামতে হবে না।’

রাজশাহীতে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করা ময়ুরী বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষের মতো না হলেও বিদ্যমান আইনে বিচার করা হচ্ছে। এতে নানা ধরনের নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হতে হয়, যা বন্ধ করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আলাদা একটি আইন করতে হবে। তাতে নিজ পরিবারে পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।’

বর্তমান সরকার ট্রান্সজেন্ডারদের স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রথমবারের মতো চলমান জনশুমারিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা এবং লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মানুষকেও আলাদাভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। মতবিনিময় সভায় প্যানেল আলোচকরা বলেন, এই জনগোষ্ঠীর অবস্থার পরিবর্তনে স্বীকৃতির পাশাপাশি চাকরি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে কোনও প্রচেষ্টারই কার্যকর সুফল আসবে না।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে- তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী শিক্ষা থেকে ঝরে পরা রোধে কর্মসূচি নেওয়া, পারিবারিক বাধা কাটাতে প্রশিক্ষিত কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার স্পষ্ট করা, নাগরিক অধিকার ও পরিসেবা প্রাপ্তির বাধার ক্ষেত্রে আইনগত নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করা, পরিচয়পত্রসহ সব সার্টিফিকেটে লিঙ্গ পরিচয় সহজীকরণ করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের প্রক্রিয়া সহজ করা, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে বেসরকারি খাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন বলেন, ‘ট্রান্সজেন্ডারদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার সময় এসেছে। তাদের মেইনস্টিমে নিয়ে আসতে উপার্জনের ব্যবস্থা করতে হবে। এই জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে পারলে তারা দেশের জন্য বোঝা নয়, উন্নয়নেও অংশীদার হতে পারে।’

বিষয়টি নিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের আমরা ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে বিবেচনা করি। তাদের জাতীয় যুব পুরস্কার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে এই মুহূর্তে আমাদের আর কোনও পদক্ষেপ নেই। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। তাদের অবস্থার উন্নয়নে সামাজিক সচেতনতাও প্রয়োজন রয়েছে।’

সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক পরিবর্তনের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে সবার আগে পারিবারিকভাবে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং পুনর্বাসিত করতে হবে। তাদের ঘরছাড়া রোধ করতে না পারলে রাস্তায় এসে দাঁড়াবেই। সেজন্য উত্তরাধিকার, আইনগত এবং কর্মসংস্থানের বাধাগুলোও দূর করতে হবে।’

/আরকে/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম