দেওয়ানি আদালতের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়েরের সুযোগ রয়েছে। দ্রুত প্রতিকারের আশায় জনস্বার্থে আইনজীবীরা কিংবা সরাসরি ভুক্তভোগীরা ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টেই দ্বারস্থ হন বেশি। এসব মামলার কোনওটিতে অন্তর্বর্তীকালীন সামান্য পরিমাণ ক্ষতিপূরণ মিললেও রুল শুনানি ঝুলে থাকে বছরের পর বছর।
২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর শাহজাহানপুর রেল কলোনিতে একটি খোলা নলকূপের পাইপে পড়ে যায় চার বছরের শিশু জিহাদ। এরপর প্রায় ২৩ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়েও তাকে উদ্ধারে অপারগতা প্রকাশ করে ফায়ার সার্ভিস। এর কিছু পরই কয়েকজন তরুণের তৎপরতায় তৈরি করা যন্ত্রে পাইপের নিচ থেকে তুলে এনে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় একটি মানবাধিকার সংগঠন জনস্বার্থে ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট দায়ের করে। এরই ধারাবাহিকতায় চার বছরেরও বেশি সময় পর ওই শিশুর পরিবার ক্ষতিপূরণের ২০ লাখ টাকা হাতে পায়।
এভাবে রিট মামলার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের উদাহরণ রয়েছে বেশকিছু। ক্ষতিপূরণ বাবদ গ্রিনলাইন পরিবহনের বাসচাপায় পা হারানো প্রাইভেটকারচালক রাসেল, রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নি দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া চার রোগীর পরিবার এক কোটি টাকা করে, পল্টন কালভার্ট রোডের ওয়াসার খোলা ম্যানহোলে পড়ে মারা যাওয়া দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শানু মিয়ার পরিবার ক্ষতিপূরণের ৫০ লাখ টাকা পেয়েছে।
তবে ক্ষতিপূরণ না পেয়ে মামলা ঝুলে থাকার তালিকাটাও বেশ লম্বা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিশুক মুনীরের পরিবারের করা ক্ষতিপূরণের মামলা, ভুল আসামি হয়ে কারাভোগ করা পাটকলশ্রমিক জাহালমের ক্ষতিপূরণ, ভুল আইনে বিচার করায় ভোলার ভুক্তভোগী জলিলের ক্ষতিপূরণ, তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হাসানের পরিবারকে দিতে বলা ক্ষতিপূরণ, রাজধানীর পল্লবীর বেনারসি কারিগর মো. আরমানকে দিতে বলা ক্ষতিপূরণের আদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন পর্যায়ের শুনানিতে আটকে আছে।
মানবাধিকার সংগঠন ল' অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগে রায় হচ্ছে প্রচুর। কিন্তু আপিল বিভাগে সেসব রায় আটকে যাচ্ছে। কেননা, ওখানে (আপিল বিভাগে) মামলা পরিচালনা করার জন্য ভুক্তভোগীরা সচ্ছলতার অভাবে পৌঁছাতে পারছেন না। বেশিরভাগ ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার মামলার পেছনে খরচ করতে সক্ষম নন। তাই আপিল বিভাগের মামলাও আটকে থাকে দীর্ঘদিন ধরে।
মানবাধিকার সংস্থা চিলড্রেন’স চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের (সিসিবি ফাউন্ডেশন) পরিচালক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সিসিবি ফাউন্ডেশনের ক্ষতিপূরণের মামলা ছিল জিহাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে। হাইকোর্টে রিটের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দিতে পারে কিনা সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণ এসেছে। এই মামলায় ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছিল। পরে আপিল বিভাগ ২০ লাখ দিতে বলেন। তা পরিশোধও হয়েছে। পরবর্তীতে এ ধরনের ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের ও শুনানির ভিত্তিগুলো আরও উন্নতি লাভ করে। একের পর এক নজির তৈরি হয়। তবে হাতে গোনা কয়েকটি মামলায় এ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মামলার রুল শুনানি না হওয়ায় ভুক্তভোগীদের কষ্ট দ্বিগুণ হয়। তাই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই ভুক্তভোগীদের অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিৎ।
ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব মনে করেন, ক্ষতিপূরণ চেয়ে দায়ের করা মামলাগুলো বিশেষভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনতে পারলে সেগুলো নিষ্পত্তিতে আর বছরের পর বছর অপেক্ষায় করতে হবে না ভুক্তভোগীদের। সুপ্রিম কোর্টের লিগ্যাল এইড শাখা সংশ্লিষ্টরা এই বিষয়ে যোগাযোগ করে উদ্যোগ নিতে পারেন।
আইনজীবী ইশরাত হাসানের পরামর্শ হলো, হাইকোর্টে একটি ক্ষতিপূরণের রিট দায়ের করলে রুল জারি করা হয়। এরপর ৩-৪ বছর পার হয়ে যায়। তারপর হাইকোর্টের রায় হলেও রাষ্ট্রপক্ষের আপিলে রায়টি আপিল বিভাগে স্থগিত হয়ে থাকে। রাষ্ট্র যেহেতু নাগরিকদের থেকে ট্যাক্স নেয় সেহেতু রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। তাই রাষ্ট্র বা সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক একটি বোর্ড গঠন করা থাকলে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ সহজ হয়। এতে করে তাদের ভোগান্তি অনেকাংশে লাঘব হবে।









