রাজধানীর উত্তরায় মেয়াদোত্তীর্ণ ক্রেন দিয়ে অতিরিক্ত ওজনের গার্ডার স্থানান্তরের সময় গার্ডার চাপায় পাঁচজন নিহতের ঘটনার দায় চাইনিজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গেজুবা গ্রুপ (সিজিজিসি) এড়াতে পারে না। যোগ্য লোক দিয়ে প্রকল্পের কাজ পরিচালনা না করার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
দুর্ঘটনায় বিভিন্ন ধরনের গাফিলতির অভিযোগে ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যাব)। এছাড়া, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থার বিষয়ে পরে জানা যাবে।
র্যাব বলছে, গত সোমবার (১৫ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর উত্তরায় প্রাইভেট কারের ওপর গার্ডার পরে পাঁচজন নিহতের ঘটনা খুবই মর্মান্তিক। এসময় ঘটনাস্থলে যারা দায়িত্বরত ছিল এবং প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা ছিল তাদের ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব ভারী কাজের সময় কোনও ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যারা এসময় কাজ করছিলেন, তারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেননি। পুলিশকে কোনও ধরনের তথ্য জানানো হয়নি। এছাড়া, ক্রেন দিয়ে গার্ডার স্থানান্তর করার জন্য সিগনাল অপারেটর ছিল না। ক্রেনের ফিটনেস সার্টিফিকেট ছিল না। সেই ক্রেনটি দিয়ে ৪৫-৫০ টন ওজনের গার্ডার স্থানান্তর সম্ভব। কিন্তু যে গার্ডারটি সরানো হচ্ছিল তার ওজন ৬০-৭০ টন। এ কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দুর্ঘটনায় যাদের গাফিলতি পেয়েছি, তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া, মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে যোগ্য লোক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকাদের কাজে গাফিলতির কারণে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ক্রেন সরবরাহ যারা করেছে তাদেরকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি হত্যাকাণ্ড। এ হত্যাকাণ্ডের দায় তারা এড়াতে পারে না। দায়ীদের চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি দাবি জানান তারা।
তারা বলেন, আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছি। দুঃখ-যন্ত্রণা সব আমাদের সামলাতে হচ্ছে। সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহি না থাকার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটার পরও তারা পার পেয়ে যায়। প্রকল্পের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতির কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
দুর্ঘটনার পর নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রজেক্টের ঠিকাদারি চাইনিজ প্রতিষ্ঠান সিজিজিসি’র দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটে। অবহেলাজনিত কারণ উল্লেখ করে সিজিজিসি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা অভিযোগে বলা হয়।
এদিকে, বৃহস্পতিবার (১৮ আগস্ট) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নূরীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। তিনি এ ঘটনায় শোক এবং নিহতের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
এ সময় চীনের রাষ্ট্রদূত গার্ডার দুর্ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনও আপত্তি থাকবে না বলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবকে জানান।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী বলেন, ঘটনা তদন্তে কমিটিতে বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষে প্রাইভেট কারে করে আশুলিয়া যাবার পথে উত্তরায় গার্ডারের চাপায় ৫ জন নিহত হন। এ সময় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান প্রাইভেটকারে থাকা নব দম্পতি।









