লালমনিরহাট জেলাধীন পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যমান পাথর ভাঙা ইউনিটগুলোর মালিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং পাথর ভাঙা শ্রমিকের স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কিত প্রতিবেদনসহ তাদের তালিকা প্রস্তুত ও তা আদালতে দাখিলের নির্দেশ প্রদান করেছেন হাইকোর্ট। পরিবেশ অধিদফতরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়কে এসব নির্দেশ প্রতিপালন করতে বলেছেন আদালত।
পাশাপাশি লালমনিরহাট জেলাধীন পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যমান পাথরভাঙা ইউনিটগুলোর জন্য নির্ধারিত জোন তৈরি, নির্ধারিত জোনে পাথরভাঙা ইউনিটগুলো স্থানান্তর, অননুমোদিত সব পাথরভাঙা ইউনিট উচ্ছেদের ও পাথরভাঙা কার্যক্রমের ভয়াবহ দূষণ থেকে এলাকার পরিবেশ, শ্রমিক ও এলাকাবাসীকে রক্ষার ব্যর্থতা সংবিধান, দেশে প্রচলিত আইন আদালতের আদেশ ও সিদ্ধান্তের লঙ্ঘন বিধায় কেন তা অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। একইসঙ্গে পাটগ্রাম উপজেলায় বিদ্যামান অননুমোদিত সব পাথরভাঙা ইউনিট উচ্ছেদ এবং শুধুমাত্র ভাঙা পাথর আমদানির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও রুলে জানতে চেয়েছেন আদালত।
এছাড়া রুলে অননুমোদিত পাথরভাঙা কার্যক্রমের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার ও এ কাজের ভয়াবহ দূষণ থেকে এলাকার পরিবেশ ও শ্রমিক সুরক্ষার নির্দেশ কেন প্রদান করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১৯ জন বিবাদীকে এসব রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এ সংক্রান্ত রিটের প্রাথমিক শুনারি নিয়ে মঙ্গলবার (২৩ আগস্ট) বিচারপতি জে. বি. এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জালিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব আদেশ দেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আশরাফ আলী। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়।
প্রসঙ্গত, লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলাধীন বুড়িমারী ইউনিয়নের বুড়িমারী স্থলবন্দর দেশের একটি অন্যতম স্থলবন্দর। এ স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০/৪০০ ট্রাক পাথর আমদানি করা হয়। জেলার পাটগ্রাম উপজেলায় লালমনিরহাট থেকে পাটগ্রাম মহাসড়কের পাশে মির্জারকোর্ট এলাকায় এবং পাটগ্রাম থেকে বুড়িমারী স্থল বন্দর সড়কের উভয় পাশে উফারমারা, ঘুন্টিঘর, বুড়িমারী বাজার, বুড়িমারী স্থলবন্দর জিরো পয়েন্ট ও বুড়িমারী রেল স্টেশন নামে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বিভিন্ন স্থানে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ ছাড়া অবৈধ ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে পাথর ভাঙার কার্যক্রম। উল্লিখিত এলাকায় প্রায় পাঁচ শতাধিক পাথর ভাঙার মেশিন কার্যকর রয়েছে। আইনবহির্ভূতভাবে পরিচালিত এ পাথর ভাঙার মেশিনগুলো খোলা স্থানে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করায় এবং ধুলা ও শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা না থাকায় এসব এলাকা ধুলার রাজ্যে পরিণত হয়েছে। এসব ধুলাবালি মানুষের নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র নষ্ট করাসহ স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছে।
এছাড়া পাথরভাঙা মেশিনের ধোঁয়া, ধুলাবালি ও পাথরের গুঁড়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ায় বায়ুদূষণ এবং সৃষ্ট শব্দের কারণে শব্দদূষণ ঘটছে, যা এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট করাসহ মানুষের পরিবেশগত অধিকার মারাত্বকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। এসব এলাকায় পাথর ভাঙার বিরূপ প্রভাব বিষয়ে দেশের প্রধান প্রধান সংবাদপত্রে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা গেছে, ওই এলাকার মহাসড়ক, জনবসতি, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বাজার, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন স্থানে এসব পাথর ভাঙার মেশিনের অবস্থান। পাথরের গুঁড়া মিশ্রিত বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণের ফলে শ্রমিকসহ স্থানীয়রা শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, কাশি, ফুসফুসের প্রদাহ, যক্ষাসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
অনেকে আবার পাথরের কুচি চোখে পড়ে চোখ হারিয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে— পাথরভাঙা কাজে কর্মরত শ্রমিকরা সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যার পরিণাম অবধারিত মৃত্যু। প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য অনুসারে, ওই এলাকায় পাথরভাঙাজনিত কারণে সৃষ্ট সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ জনের অধিক শ্রমিক মারা গেছেন এবং বর্তমানে প্রায় ৭০ জনের অধিক শ্রমিক এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন।
তাই এ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ সংযুক্ত করে স্থানীয় এলাকাবাসীর আবেদনে জনস্বার্থে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) রিটটি দায়ের করে।









