ইয়াসমিন আক্তার (৩৫)। কক্সবাজারের রামু থানার মেটাছড়ি এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাড়ি। স্বামী নজির আহমেদ মারা গেছেন। থাকেন স্বামীর পৈতৃক ভিটায়। ছোট তিন মেয়েকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন তিনি। আশেপাশের অনেকে যখন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তখন আশঙ্কা থাকে কখন ইয়াসমিন মনের বিরুদ্ধে গিয়ে ইয়াবার বহনকারী হয়ে যান। তবে সেই আশঙ্কা দূর হয়েছে তার। তাকে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দিয়েছে র্যাব। প্রশিক্ষণের পর তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সেলাই মেশিন।
কক্সবাজারের এমন ৩৬ জন নারী, পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও কিশোরকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়েছে র্যাব। এদের মধ্যে ২১ জন পুরুষ ১৫ জন নারী। প্রশিক্ষণ কর্মশালা শেষে বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজারের লং বিচ হোটেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তাদের হাতে সনদ ও বিভিন্ন সামগ্রী তুলে দেন।
এসব মানুষের কারও কারও বন্ধু ও স্বজনরা বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। দারিদ্রতার কারণে তাদেরও অপরাধে জড়ানোর সম্ভাবনা ছিল। র্যাব তাদের অপরাধে জড়ানোর আগেই প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ইয়াসমিন আক্তারও প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
ইয়াসমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমাকে নিয়ে এসেছে। আমি সেলাই মেশিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এলাকাতে সেলাইয়ের কাজ করবো।
তিনি বলেন, স্বামী মারা যাবার পর মানুষের সাহায্য নিয়ে চলছি। তিন মেয়েকে নিয়ে খুব কষ্টে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাই। প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এখন কাজ করে সংসার চালাবো।
সাইফুল ইসলাম (২৮)। কক্সবাজারের পূর্ব কলাতলী তার বাড়ি। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট সাইফুল। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে সে। এলাকায় সে দিনমজুরের কাজ করতো। নবজাগরণের প্রকল্পে সে ফটোগ্রাফারের প্রশিক্ষণ নিয়েছে। রফিক নামের এক যুবকের মাধ্যমে সে র্যাবের এই প্রশিক্ষণের আওতায় আসে। কক্সবাজারের সমুদ্র তীর এলাকায় সে এখন পর্যটকদের ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত। তাকে ক্যামেরা ও সনদ দেওয়া হয়েছে।
স্ত্রী সেতারা আক্তার বাসায় দর্জির কাজ করে। এক ছেলে, ২৮ মাস বয়স। তাকে লেখাপড়া করাতে চান সাইফুল। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে এই প্রশিক্ষণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করছেন।
সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি এখন থেকে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করবো। আমাদের সকল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
সৈয়দ হোসেন (৩৫) থাকেন কলাতলীর বাবার বাড়িতে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পড়ালেখা করতে পারেননি। র্যাবের মাধ্যমে সার্ফিং প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। কক্সবাজারে সার্ফিংয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে সার্ফিং করে আয় করার সুযোগ সৃষ্টি করতে কাজ করছে প্রসাশন। তার মতো আরও পাঁচ জন এবিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
হাউজ কিপিংয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছে সাবরিনা ইয়াসমিন সোনালী। তিনি একটি রেস্টুরেন্টে চাকরি করতেন। তিনিও এখন হোটেলে কাজ করার উপযুক্ত হয়ে উঠেছেন।
জান্নাতুলি বাকিয়ার গ্রামের বাড়ি দক্ষিণ মিটাছড়ি। তিনিও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এখানে।
ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়া তৌহিদুল ইসলাম তৌহিদ বলেন, পর্যটন এলাকা কক্সবাজারের পর্যটন সেক্টরের পরিবেশ উন্নয়নে আমরা ভূমিকা রাখবো।
সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়েছে সেতারা আক্তার মুক্তা। তিনি বলেন, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা স্বাবলম্বী হতে পারবো। এতে আমার বেকারত্ম দূর হবে। আমরা যারাই প্রশিক্ষণ নিয়েছি তারা সবাই সাবলম্বী হবো।
র্যাবের মহাপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সারাদেশে যে মামলা হয় তার ৪০ শতাংশ মাদকের মামলা। আমরা প্রতিবছর অনেক মাদক উদ্ধার করি। কিন্তু মাদক কারবারিরা তাদের পাচারের ধরণ পরিবর্তন করে, আমরাও অভিযানের ধরণ পরিবর্তন করি।
তিনি বলেন, মাদক প্রতিরোধে আমরা কিছু গঠনমূলক, সৃজনশীল ও গবেষণামূলক কাজ করেছি। যেসব জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি, যোগাযোগ রাখছি। যারা যে কাজ করতে চায়, সেই কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছি।









