স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে ১৯৮৩ সালে গঠিত সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। প্রগতিশীল ধারায় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে জোট বিভিন্ন সময়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে আসছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ব্যাপক সক্রিয় হতে দেখা যায়। এবার আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের জোর তৎপরতা বাড়াচ্ছে জোটটি, যা ডিসেম্বরের শুরুর দিকে নতুন ‘রোডম্যাপ’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে বলে জানা গেছে।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, আগামী বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল শক্তির পক্ষে সক্রিয় হচ্ছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। নতুন কমিটি গঠনের পর চলতি মাসেই জোটের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমমনা অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেছে তারা। প্রথম ধাপের এই প্রক্রিয়া চলবে অক্টোবর মাসজুড়ে। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনেও মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন জোট নেতারা। দ্বিতীয় ধাপে নভেম্বর মাসে নীতিনির্ধারণী সংগঠন ও নেতাদের মধ্যে কর্মকৌশল নিয়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই দুই ধাপের আলোচনার ভিত্তিতে একটি ‘রোডম্যাপ’ প্রস্তুত করে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রাজধানীতে মহাসমাবেশের মাধ্যমে ঘোষণা করা হবে।
এ বিষয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদ্যমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ধারাবাহিক মতবিনিময় সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আগামীর করণীয় নির্ধারণ করা হবে। ধাপে ধাপে আন্দোলনে যাবো, রাস্তায় মানববন্ধন করবো। তারপর সেমিনার করবো, বড় সমাবেশের আয়োজন করবো। তারপরে হয়তো ধর্মঘট ডাকা হবে। সেজন্য জনগণকে প্রস্তুত করতে হবে, সংগঠনকে প্রস্তুত করতে হবে। বৃহত্তর আন্দোলনের কোনও বিকল্প নেই। আমরা বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
ততোধিক সূত্র বলছে, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠনের মূলে থাকা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যপূরণে ফের সক্রিয় হওয়ার কোনও বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ জোটের ওপর মনোস্তাত্ত্বিক চাপ ক্রমাগতভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন কমিটি এখন জোটের তৎপরতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রক্রিয়া এরইমধ্যে শুরু হয়েছে, যা দৃশ্যমাণ হয় ২৭ সেপ্টেম্বরের মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে।
ওইদিন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার হলে ‘সম্প্রীতির সমাজ এবং মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে’ শীর্ষক মতবিনিময় সভাটি করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সেখানে জোট গঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ের তৎপরতা এবং আগামী দিনের কর্মকৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এমন আরও অনেকগুলো সভা করার পরিকল্পনা রয়েছে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ শরিক দলগুলো এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও জোট নেতারা বৈঠক করতে চান বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
জোটের নতুন রোডম্যাপে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে, তার একটা ধারণা মিলেছে গত ২৭ সেপ্টেম্বরের মতবিনিময় সভায়। প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী সভায় ব্যাপক আলাপ-আলোচনার পর ‘সম্প্রীতির সমাজ নির্মাণে ৬ দফা করণীয় নির্ধারণ’ করা হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, শিক্ষক, শিল্পী ও নারীদের ওপর হামলায় জড়িতদের গ্রেফতারের পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, সংবিধানে প্রদত্ত অধিকার বলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধসহ জনজীবনের নানাবিধ সংকট দূর করা, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও নারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সম্প্রীতির বাংলাদেশ নির্মাণ এবং যেকোনও সংকট মোকাবিলায় সামাজিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ কর্মপন্থা গ্রহণের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দেশে একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তুলতে চায় জানিয়ে গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত এই জাগরণের মধ্য দিয়ে আমরা সাম্যের সমাজ, সম্প্রীতির সমাজ নির্মাণ করতে চাই। এ জন্য দেশের সব উপজেলা থেকে রাজধানী পর্যন্ত একটি করে মিলনায়তন নির্মাণ করতে হবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈতিকতা, প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা অর্ন্তভুক্ত করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোকে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা বন্ধ করতে হবে।’
অনেকে অভিযোগ করে থাকেন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও মহাজোট রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তৎপরতা ব্যাপকভাবে কমে যায়। মাঝে মাঝে বিভিন্ন বার্নিং ইস্যুতে কিছু তৎপরতা আর জাতীয় পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য কেউ মারা গেলে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল জোটটি। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে তেমন একটা তৎপরতা দেখা যায়নি বলেও বলছেন অনেকে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানিয়েছেন, ২০০৭-৮ সালের দিকে সামরিক শাসনের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জরুরি অবস্থায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিচ্ছিন্ন ছিল। সে সময় দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য লাগাতার আন্দোলন করেছি আমরা। সেই নির্বাচনে আমাদের প্রধান দাবি ছিল— যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে রাষ্ট্র ও সমাজে পুনপ্রতিষ্ঠিত করা। এসব ইস্যুতে পরবর্তী সময়ে সর্বশক্তি নিয়ে আমরা সোচ্চার ছিলাম।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শাপলা চত্বরে হেফাজতের লঙ্কাকাণ্ডের বিরুদ্ধে হরতাল পালন, বিএনপি-জামায়াত জোটের জ্বালাও-পোড়াও নৈরাজ্য, ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন এবং করোনাকালে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে বাধা, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ঢাকাসহ সারা দেশে আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, যোগ করেন তিনি।
দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর পর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর। সেখানে গোলাম কুদ্দুছকে সভাপতি এবং আহকাম উল্লাহকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওইদিন নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে সংগঠনটির ১০১ সদস্যের নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। নতুন এই নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয় আগামী দিনের কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে।
জানা যায়, সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের সময় শহীদ মিনারে আলপনা আঁকা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ফুঁসে ওঠে। ১৯৮৩ সালে অমর একুশের অনুষ্ঠানমালার মধ্যে দিয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের যাত্রা শুরু হয়। পরের বছর ১৯৮৪ সাল থেকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ৮-১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২ দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তি বেড়েছে।
আরও পড়ুন:









