মো. জব্বার মোল্লার বয়স এখন ৬৭। গত ৫০ বছরই কেটেছে তার বাসাবাড়িতে চুরি করে। চুরির আগে সঙ্গীদের নিয়ে দিনের বেলায় বিভিন্ন বাসা টার্গেট করে পেশাদার চোর জব্বার মোল্লা। একজন বয়স্ক মানুষ,দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবি পরে চলাফেরা করায় কারও সন্দেহ করার কারণ নেই যে সে পেশাদার চোর। ৮ বছর বয়স থেকে মিরপুর, কাওরান বাজার, সংসদ ভবন এলাকায় টোকাইয়ের কাজ করলেও তখন থেকেই বিভিন্ন বাসাবাড়িতে রোদে শুকাতে দেওয়া কাপড় চুরি করতো। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে বাসাবাড়ির দরজা ভেঙে চুরি করে আসছিল ষাটোর্ধ্ব জব্বার মোল্লা ও গ্রুপের সদস্যরা। এই চোর চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পেয়েছে পুলিশের গুলশান গোয়েন্দা বিভাগ।
চলতি বছরের ১৭ আগস্ট খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ-২-এর ১৫ নম্বর রোডে এক ডাক্তার দম্পতির বাসায় দিনের বেলায় দুর্ধর্ষ চুরি হয়। চোর চক্রের সদস্যরা ওই বাড়ির তৃতীয়তলার দরজা ভেঙে ঘরের ঢোকে। তারা আলমারির তালা ভেঙে ৪২ ভরি সোনা ও ৪ হাজার ইউএস ডলার চুরি করে। মামলা দায়েরের পর ছায়াতদন্তে নামে গুলশান গোয়েন্দা বিভাগ। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় জড়িত চোর চক্রকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় ক্যান্টনমেন্ট জোনাল টিমের সদস্যরা।
পরে ৮ অক্টোবর মিরপুর পল্লবী এলাকার আরেকটি বাসায় চুরি করতে যাওয়ার সময় গ্রেফতার করা হয় এই চক্রের মূল হোতাসহ ৬ জনকে। গ্রেফতারকৃতরা হলো— দলের সর্দার মো. জব্বার মোল্লা (৬৭),আজিমুদ্দিন (৫২),মো. জামাল (৪৪), মো. আবুল (৫০),দুটি জুয়েলারি দোকানের মালিক— মো. আনোয়ার হোসেন (৪৪) ও মো. আব্দুল ওহাব (৪৫)। এসময় তাদের কাছ থেকে প্রায় ৯ ভরি সোনা ও ৮২ ভরি রুপা, নগদ প্রায় ১৭ লাখ টাকা, দরজা ভাঙার যন্ত্রপাতি এবং মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
অভিনব কায়দায় চুরি
জব্বার মোল্লা বৃদ্ধ মানুষ। সবসময় পরনে থাকে সাদা পাঞ্জাবি-লুঙ্গি ও মাথায় টুপি। মূলত এই বেশভূষাই চোর চক্রটির প্রধান হাতিয়ার। অপরিচিত ভবনে ঢুকলেও কেউ তাদের সহজে সন্দেহ করে না। কেউ জিজ্ঞাসা করলে কৌশলে তারা প্রশ্নের উত্তর দেয়। দিনের বেলায় বিভিন্ন জেলা থেকে এসে তারা এক জায়গায় একত্রিত হয়। এর একটি এলাকা থেকে হাঁটা শুরু করে এবং সুবিধা মতো ভবন টার্গেট করে। ভবনে ঢুকে বিভিন্ন ফ্লোরে ঘুরে যে বাসার প্রধান দরজা লক করা থাকে, বিশেষভাবে তৈরি দেশীয় অস্ত্র দিয়ে সেই বাসার দরজা ভেঙে চুরি করে তারা।
টানা ৫০ বছর ধরে চুরিই তার পেশা
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জব্বার ও আজিম উদ্দিন জানায়, ৮-১০ বছর বয়স থেকে তারা ঢাকার কাওরান বাজার, মিরপুর, সংসদ ভবনের আশপাশের এলাকায় টোকাইগিরি করতো তারা। এ সময় তারা বাসাবাড়ির ছাদে রোদে দেওয়া জামাকাপড়, জুতা, রড ইত্যাদি চুরি করে বিক্রি করতো। চোরাই মাল বিক্রি করতে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং তারা একত্রে চুরি করে। এরপর বিগত ২০-২৫ বছর ধরে ঢাকা নগরীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দরজা ভেঙে বাসায় ঢুকে চুরি করে আসছে এই চক্রটি।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও জানায়— ঘটনার আগের দিন চক্রের সদস্যরা নিজেদের মাঝে আলোচনার পর এলাকা টার্গেট করে। পরদিন সকাল বেলা তারা ওই এলাকায় হাজির হয়। একত্রে চা পান করার পর তারা হাঁটতে থাকে এবং খেয়াল করে কোন বাসায় দারোয়ান ও সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। বাসা টার্গেটের পর দুই জন বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। বাকি ২-৩ জন বাইরে পাহারায় থাকে। ১০ মিনিটের মধ্যে চুরি শেষ করে মালামাল ভাগ করে নিয়ে যে যার এলাকায় চলে যায়। পরদিন আবার অন্য কোথাও চুরির পরিকল্পনা করে। তারা শুধু মূল্যবান অলংকার, বিদেশি মুদ্রা ও টাকা চুরি করে।
জুয়েলারিতে চোরাই সোনা বিক্রি
গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটি জানায়, চোরাইকৃত স্বর্ণালংকার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এলাকার দুটি দোকান এবং পার্শ্ববর্তী মহানগর এলাকায় একটি স্বর্ণের দোকানে বিক্রি করে সেই টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতো। শত শত ভরি স্বর্ণালংকার এসব জুয়েলারি মালিকদের কাছে বিক্রি করেছে বলে তারা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে।
তাদের দেওয়া তথ্যমতে, গাজীপুরের একটি সোনার দোকানের মালিক আনোয়ার হোসেন ও মহানগর দক্ষিণের একটি জুয়েলারির মালিক মো. আব্দুল ওহাবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ৮ ভরি সোনা, ৮২ ভরি রুপা ও ১৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৫২ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
সোনার দোকানের এই মালিকরা স্বীকার করেছে, তারা চোরাই সোনা কিনে গলিয়ে ফেলে দ্রুত বিক্রি করে দেয়।
ভবন মালিকদের সতর্কতা প্রয়োজন
মহানগরের বিভিন্ন বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটেদের দেখা যায়, অনেক বহুতল ভবনে নিরাপত্তামূলক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেন না। অনেকেই সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও লাইন ডিসকানেক্টেড রাখেন বা চেক করেন না, অথবা ব্যাকআপ থাকে না। এসব চোর চক্র মূলত যেসব ভবনে দারোয়ান থাকে না, সেগুলোকে টার্গেট করে। সুতরাং, বহুতল ভবনের মালিক এবং ভাড়াটেদের অবশ্যই নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ করা উচিত বলে মনে করেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
জুয়েলার্স সমিতিকে পদক্ষেপ নিতে হবে
পুলিশ বলছে, জুয়েলারির মালিকরা কোথা থেকে, কার কাছ থেকে, কীভাবে সোনা কিনছেন, যথাযথ ভাউচারের মাধ্যমে, বৈধ উৎস থেকে কিনছেন কিনা, এ ব্যাপারে খোঁজখবর রাখতে হবে জুয়েলার্স সমিতির নেতাদের। অবৈধ উৎস থেকে সোনা কেনাবেচার কারণে অনেক ক্ষেত্রে চুরি, ডাকাতি, দস্যুতা, অপহরণ, খুনের মতো অপরাধের সংশ্লিষ্টতা থাকে। অবৈধ উপায়ে সোনা কেনাবেচার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে কঠিন আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যা বলছে পুলিশ
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্রেফতারকৃত চোরদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক চুরির মামলা রয়েছে। আসামিদের আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের আরও সদস্য এবং চোরাই অলংকারের বিষয়ে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।









