নিরাপদ সড়ক নিয়ে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ ও সামাজিক আন্দোলন জোরালো হচ্ছে। তবু সড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল। সড়ক দুর্ঘটনার এক বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১০ বছরে প্রতিদিন সড়কে গড়ে মারা যাচ্ছে ১৭ জন। ‘নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২২’ সামনে রেখে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে গাড়িচালকদের সঙ্গে কথা বলেছে বাংলা ট্রিবিউন। সড়কে নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা থেকে সড়ক দুর্ঘটনা ও সমাধান চিহ্নিত করেছেন তারা।
গাড়িচালকরা মনে করেন, পথচারীরা সচেতন হলেই কমে আসবে সড়ক দুর্ঘটনা এবং আইনের কঠোর ব্যবহার জরুরি। এ ছাড়া মহাসড়কে অবৈধ ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিষিদ্ধ করা, নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামানো নিশ্চিত করা, পুলিশের লেজার লাইট ব্যবহার বন্ধ করা, বাসের জন্য আলাদা লেন তৈরি করা, মহাসড়কের আধুনিকীকরণসহ বেশ কিছু বিষয়ে জোর দিচ্ছেন চালকরা।
হুট করে রিকশা চলে আসে
ঢাকায় পাঁচ বছর ধরে প্রাইভেটকার চালান মো. হাসান। তিনি বলেন, ‘সাধারণ পথচারীরা যদি সচেতন হয়, তাহলে দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে। আমরা অনেক সময় দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাই। হঠাৎ আইল্যান্ড থেকে মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে। গাড়ি গতিতে থাকলে তো থামাতে সময় লাগবে। আর ঢাকা শহরে পথচারী ছাড়াও বড় সমস্যা হলো রিকশা। তারা তিন-চার জন মিলে ওভারটেক করে। হুট করে সামনে রিকশা চলে আসে। ঢাকায় রিকশা কমানোর বিষয়টা সরকারের ভাবা উচিত।’
যে যেমন খুশি রাস্তা পার হয়
সাত বছর আগে ভোলা থেকে ঢাকায় আসেন মো. মহসিন। পেশা হিসেবে তিনি বেছে নেন সিএনজি অটোরিকশা চালানোকে। তিনি বলেন, ‘মানুষ ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হয় না, জেব্রা ক্রসিং দিয়েও যায় না; রাস্তার মাঝখান দিয়ে যেমন খুশি পার হয়। কানে মোবাইল ফোন রেখে হাঁটে। গাড়ি কোন গতিতে আসছে, তাও খেয়াল করে না। সামনে এসে হাত দেখায়। ব্রেক কষলেই যে গাড়িটি থামবে, তার নিশ্চয়তা তো নেই। বিপদ হলে সব দোষ আমাদেরই হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাসগুলো রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠায়। সোজা যেতে যেতে হঠাৎ ডান-বাম করে। আমাদের ছোট গাড়ি, বাস চাপ দিলে আমাদেরও চাপাতে হয়। সামনে হুট করে মানুষ এলে কিছু করার থাকে না। বাসগুলোর জন্য আলাদা রাস্তা হলে আর মানুষ যদি নিয়ম মেনে চলাচল করে, তাহলে দুর্ঘটনা অনেক কমবে।’
বাসের জন্য আলাদা লেন করে দিক
সদরঘাট-টঙ্গী রুটে আজমেরি গ্লোরি বাস চালান মিঠুন মিয়া। বাস চালনায় ১৩ বছরের অভিজ্ঞ এই চালক বলেন, ‘ফোনে কথা বলতে বলতে বাসের সামনে এসে হাত দিয়ে থামতে বলে। গাড়ি ব্রেক কষে দাঁড়াতেও তো সময় লাগে। ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও সেটা দিয়ে পার হয় না। দুটি বাসের মাঝে বাইক ঢুকিয়ে দেয়, একটু উনিশ-বিশ হলেই দুর্ঘটনা ঘটে। সিএনজি অটোরিকশা হুট করে সামনে চলে আসে, ছোট গাড়ি বোঝাও যায় না। এক্সেল চাপ দিলেই যে ব্রেক হবে, এমন না। এটা তো যন্ত্র, কাজ না-ও করতে পারে। সব সময় সাবধানে চালাই। তা-ও কখন কী হয়ে যায় আল্লাহ জানেন। বাসের জন্য আলাদা লেন করে দিক আমাদের। মানুষ-গাড়ি কেউ ঢুকতে পারবে না, শুধু বাস যাবে। আমরা তাহলে স্টপেজ ছাড়া থামবও না।’
পুলিশ লেজার লাইট মারে একদম চোখে
মো. বাবুল মিয়া কাভার্ড ভ্যানের চালক। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে মালামাল আনা-নেওয়া করেন তিনি। গত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, ‘কাভার্ড ভ্যান যেহেতু লোডেড থাকে, তাই আমরা এক লাইনে যাই, চার-পাঁচটা গাড়ি একসঙ্গে যায়। মহাসড়কে অটোরিকশা, ট্যাম্পু সামনে চলে আসে, এলোমেলোভাবে চলে, বাস বাউলি দিয়ে সামনে চলে আসে, দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের পাঁচ টন মাল লোড থাকে, ব্রেক কষলেও দাঁড়াতে সময় লাগে। বাস একদম সামনে দাঁড়ালে লেগে যেতে পারে, বাসভর্তি মানুষ, একটা ধাক্কা লাগলেই শেষ।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাঝেমধ্যে মানুষ দৌড়ে পার হতে যায়। বড় গাড়ি, অনেক সময় দেখাও যায় না যে মানুষ যাচ্ছে। এদিকে পুলিশ লেজার লাইট মারে একদম চোখে। চোখে লেজার লাগলে চোখে ধান্দা লেগে যায়। তখন সামনে কী আছে দেখা যায় না।’
বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়ের মতো সড়ক সারা দেশে হলে চলাচল স্বাভাবিক হবে
মো. আব্দুস সালাম পিকআপ চালান ৩০ বছর ধরে। ছোট-বড় পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক সবই চালিয়েছেন। সড়কের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘কিছু হলেই ড্রাইভারদের দোষ হয়। ছোট ব্যাটারিচালিত গাড়িগুলো ডান-বাম মানে না, রাস্তার মাঝখানে হাটবাজার বসে, মানুষ ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে না গিয়ে রাস্তার মাঝ দিয়ে পার হয়, লোকাল বাসগুলো রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যাত্রী নেয়, এলোপাতাড়ি বাউলি দেয়। যখন লোডেড গাড়ি থাকে, তখন চাইলেও থামানো যায় না।
আব্দুস সালাম বলেন, ‘ভাঙ্গা (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়ক) এক্সপ্রেসওয়ের মতো সড়ক সারা দেশে হলে রাস্তায় চলাচল স্বাভাবিক হবে। তেজগাঁও ইউটার্নের মতো সব জায়গায় ইউটার্ন দিলে রাস্তায় শৃঙ্খলা আসবে।’









