তামাকজাত পণ্যে কর কম হওয়ায় রাজস্বনীতিতে জনস্বাস্থ্য উপেক্ষিত হচ্ছে বলে একটি সভায় দাবি করা হয়েছে। আলোচকরা মনে করেন, সুনির্দিষ্ট কর আরোপের বিধান বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং কর ফাঁকি রোধ হবে।
মঙ্গলবার (২৫ অক্টোবর) সচিবালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের কনফারেন্স কক্ষে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্টের উদ্যোগে ‘তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট কর আরোপের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক পরামর্শমূলক সভায় এমন দাবি করা হয়। সভায় তামাকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে রাজস্ব আয়ের জন্য অন্যান্য মাধ্যম খুঁজে বের করার আহবান জানানো হয়।
তামাক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য যেমন কোমল পানীয়, মিষ্টি, প্রক্রিয়াজাকৃত (এসএসবি) খাবারের ওপর কর বাড়িয়ে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. এনামুল হক এর সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. নাজমুল হোসেন। সভায় স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অর্থনীত ইউনিট এর পরিচালক (গবেষণা) সৈয়দা নওশীন পর্ণিনী।
আলোচনাপর্বে সম্মানিত অতিথি এবং বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সমন্বয়কারী (অতিরিক্ত সচিব) হোসেন আলী খোন্দকার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরুদ্দীন আহমেদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব কাজী রেজাউল হাসান, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের সমন্বয়কারী সাইফুদ্দিন আহমেদ, দ্য ইউনিয়নের কারিগরি পরামর্শক এড. সৈয়দ মাহবুবুল আলম এবং ৭১ টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি সুশান্ত সিনহা। এছাড়া সভায় উন্নয়ন সমন্বয়, টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি), ডেভেলপমেন্ট অ্যক্টিভিটস অব সোসাইটি (ডাস), প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠন, নাটাব, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশেনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন তামাক নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ পদ্ধতিটি আন্তর্জাতিকভাবে সফলতা অর্জন করেছে। কিন্তু সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তামাক পণ্যের নিম্নমূল্য এবং কর, কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী প্রচারণা এবং হস্তক্ষেপের প্রেক্ষিতে মানুষের মাঝে তামাকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা সার্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি উৎকণ্ঠার বিষয়। গত ১২ বছরে বাংলাদেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ এবং এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। কিন্তু নিম্ন ভিত্তিমূল্যের কারণে প্রতিবছর খুব সামান্য পরিমাণে কর বৃদ্ধি পেলেও বিক্রয়মূল্য আদতে তামাক ভোক্তার নাগালের মধ্যেই থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে সকল প্রকার তামাকজাত পণ্যের ভিত্তিমূল্য খুবই কম। ফলে উচ্চহারে করারোপ করলেও মূল্য বৃদ্ধিতে তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না। তামাক পণ্যের ক্ষেত্রে প্রচলিত এড ভ্যালোরেম কর পদ্ধতির ত্রুটিগুলো বিবেচনায় নিয়ে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা হলে পণ্যের চাহিদা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এছাড়াও আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত যে, সুনির্দিষ্ট কর হিসাব করা তুলনামূলক সহজ এবং পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলে।
প্রত্যেকটি ব্র্যান্ডের তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের গায়ে খুচরা মূল্যের পূর্বে “সর্বোচ্চ” শব্দটি উল্লেখিত না থাকার সুযোগ নিয়ে খুচরা মূল্যের থেকে স্থানভেদে ১০-২৫ টাকা অধিক মূল্যে বিক্রয় হয়। এই অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রয় হওয়ার কারণে সরকার প্রতিদিন প্রায় ১৩.৬৮ কোটি টাকা এবং প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
দ্রব্যের উপর আরোপিত মূল্য সংযোজন কর, সম্পূরক শুল্ক, স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের উপর সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করলে তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
সভায় তামাকের পাশপাশি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য পণ্য যেমন এসএসবি এর ওপর কর বৃদ্ধির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশন গঠন বিষয়ে আলোচনা করেন। স্বাস্থ্য বাজেট কমিয়ে আনার জন্য এ বিষয়ে হেলথ ইকোনোকস ইউনিট গবেষণা করতে পারে।
এছাড়া স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং ব্যবস্থা প্রচলনের পাশপাশি কর আদায় ব্যবস্থা আধুনিকায়নের মাধ্যমে তামাকজাত পণ্যের উপর কর ফাঁকি রোধ করা সম্ভব বলে সভায় মনে করা হয়।









