আইনি সুরক্ষা সহজ হতে পারে?

উদিসা ইসলাম
১৫ নভেম্বর ২০২২, ০৮:০০আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২২, ০৮:০০

তিন সন্তানের মা গার্মেন্টসকর্মী রাবেয়া বিয়ের সাত বছরের বেশিরভাগ সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তার স্বামী লিটন সংসারে নিয়মিত টাকা দেন না, কারণে-অকারণে তাকে মারধর করেন, সন্তানদের দেখাশোনার কোনও দায়িত্ব পালন করে না, এরকম নানা অভিযোগ। এক সময় দ্বিতীয় বিয়ে করে ঘর ছাড়লেন স্বামী। এদিকে বিয়ের পরপরই প্রথমে জমজ ও পরে আরেকটি সন্তানের জন্মের পর চাকরিটাও ছেড়ে দিতে হয়েছে রাবেয়াকে। সব মিলিয়ে এই মায়ের মনে বড় প্রশ্ন হয়ে হাজির হয়েছে— আমি এখন কী করবো?

কোথায় গেলে অধিকার বুঝে পাওয়া যাবে, জানেন কিনা প্রশ্নে রাবেয়া বলেন, ‘মামলা করতে পারলে হতো, কিন্তু ভয় লাগে। তিন সন্তান নিয়ে দিনই পার হয় না। থানায় থানায় ঘুরবো কী করে? ভয় হয় মামলা করলে পোলার বাপে খেপে গিয়ে যদি সন্তানদের ক্ষতি করে!’

এই ভয় ও তথ্য না জানা, আর বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে দিন দিন বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার প্রবণতা কমছে বলে মনে করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, প্রক্রিয়া যত বেশি জটিল  হবে, তত বেশি এসবের থেকে দূরে সরে যাবে সাধারণ মানুষ।

ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ‘চ্যালেঞ্জিং ফিয়ার অব ভায়োলেন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, মাত্র ২৯ শতাংশ নারী তাদের  যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা প্রকাশ করেন। ১৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী এটা নিয়ে কোনও কথা বলেন না। ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ পরিজনদের কাছে শেয়ার করেন। ১ শতাংশ নারী আইনের আশ্রয় নেন, স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন।

কেন মাত্র এক শতাংশ আইনি আশ্রয় নেন?

অনেক ভিকটিম সর্বোচ্চ নিপীড়ন সহ্য করেও আইনের আশ্রয় নিতে চান না— কেবল যথাযথ প্রক্রিয়ার বিষয়ে না জানার কারণে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ জানেন না বিচার প্রক্রিয়ায় কোন ধাপে কী হয়? বিচার পেতে তাকে কী কী করতে হবে? রাজধানীর মিরপুরের মোল্লাপাড়ায় কয়েকটি ঘর নিয়ে বসবাস করেন কয়েকজন নারী, যারা প্রত্যেকের সংসার থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এখন  বাসাবাড়িতে কাজ করেন। সারা শরীরে অসংখ্য নির্যাতনের চিহ্ন। রাতারাতি ঘর ছাড়া হয়েছেন, কিন্তু স্বামীর বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেননি। কেন নেননি জানতে চাইলে তাদের একজন জাহানারা বলেন, ‘ওটিতে (ওই সবে) অনেক টেহা (টাকা) লাগে। আরা (আমরা) ওসবের খোঁজও ঠিকঠাক জানিনে। থানায় আমাগের (আমাদের) কথা শুনবে কে? কোর্টের বারান্দাত কেউ যায় নাই। ওসব জানিও না কিছু।’

পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ প্ল্যাটফর্ম ‘উই ক্যান’ এর সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়াগুলো একেবারেই মানুষবান্ধব না। যারা কখনও এই বিষয়গুলো জানেন না, তারা হুট করে আইনি ধাপগুলো বুঝতে পারেন না এবং ভয় পান। একইসঙ্গে মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতার কারণে ঠিকমতো ধৈর্য ধারণও প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘মানুষের জীবন বহমান। এই মামলার কাজ দ্রুত শেষ না হওয়ায় তার বাকি জীবনের কাজ তো আটকে থাকবে না। ফলে পরে একটা সময়ে গিয়ে বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে জীবন টেকানোর লড়াইয়ে নেমে পড়তে বাধ্য হয়। প্রক্রিয়া আরেকটু সহজ করলে বিচার পাওয়ার আশা বাড়বে এবং সময় মতো বিচার যদি হয়, তাহলে অপরাধও কমবে।’

ভয়ের কোনও কারণ নেই উল্লেখ করে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘নারীরা ঘরে বা বাইরে যেখানেই নির্যাতনের শিকার হন, তাদের সাহসী হয়ে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। আর যদি তা না নেয় তবে ধরেই নিতে হবে, তারা বিষয়টা লুকিয়ে ফেলতে চাইছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে মনে রাখা ভালো, একবার চেপে গেলে সেটা বারবার ঘটতেই থাকবে। এখন মানুষ নারী-শিশু আইন ও আদালতের বিষয়ে জানে। নানাভাবে প্রচারণা চালানো হয়। আর মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যমতো আছেই। তাদেরও উচিত সুরক্ষা চাইলে যে পাওয়া যায়, সেটা জানানো।’

একইসঙ্গে সাক্ষী সুরক্ষা ও ভিকটিম সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার উল্লেখ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মো. নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার ভিকটিম একটা মামলা যদিওবা করেন, সেটা প্রত্যাহারের নানামুখী চাপ সামলাতে হয় তাকে। নারী নির্যাতনের বাইরে— ধরেন গৃহশ্রমিক নির্যাতন, নির্মাণ শ্রমিক হত্যা। কোনও মামলার শেষটা দেখতে পেয়েছি আমরা? এত দীর্ঘমেয়াদি বিচার কাজের কারণে অনেক সাক্ষী পরবর্তী সময়ে আর সম্পৃক্ত থাকতে চায় না। ফলে যদি ভিকটিমের আইনি যে সুরক্ষা পাওয়ার কথা, সেটার প্রক্রিয়া আরও সহজ করে দেওয়া যায়, তাহলে ভয় ও শঙ্কা দূর করে আইনের আশ্রয় নিতে আগ্রহী হবে মানুষ।’

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম