দিন দিন ক্যানসার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। অথচ সেই অনুপাতে বাড়ছে না চিকিৎসা সুবিধা। এমনকি নেই প্রয়োজনীয়-সংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও। তবে, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টি্টিউটট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশু ক্যানসার রোগীদের জন্য পৃথক বিভাগ খোলা হয়েছে। কিন্তু ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। শিশুর ক্যানসার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন আরও লোকবল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনতলায় গিয়ে শোনা গেল পেডিয়াট্রিক অনকোলজি বিভাগের একটি রুম থেকে ভেসে আসছে শিশুর আর্তচিৎকার। আর দরোজার এ পাশে স্বজনরা দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের মুখ পাথরের মতো। অথচ চোখে টলমল করছে জল। একটু পরপর দরোজা খুলে সন্তানকে উল্টো করে ধরে বের হচ্ছেন বাবা-মা। শিশুটি কাঁদছে, খুব দ্রুত তাকে শুইয়ে দেওয়া হলো তিনতলার লিফটের কাছের ফ্লোরে।
সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখা গেল, লিফটের কাছে ফ্লোরের ওপর কেউ তোষক, কেউ শুধু বিছানার চাদর বিছিয়ে সন্তানকে উল্টো করেই শুইয়ে রেখেছেন। আর হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন পিঠে মাথায়। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এসব শিশুর জন্য দরকার একটি নীরব এয়ার কন্ডিশনড রুম। যেখানে তারা শান্তিতে একটু ঘুমাতে পারবে। অথচ এই শিশুদের রাখা হয়েছে ফ্লোরের ওপর একটি খোলা জায়গায়।
চিকিৎসকরা বলছেন, ক্যানসার আক্রান্ত এসব শিশুর মেরুদণ্ড থেকে জীবাণু নেওয়ার জন্য ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসার অংশ হিসেবে আরও একটি ইনজেকশন দেওয়া হবে তাদের। তারা বলেন, যাদের প্রযুক্তি রয়েছে, তারা অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে করেন। আমাদের অ্যানেসথেসিস্ট থাকলেও কেবল এখানে দেওয়ার জন্য লোকবল নেই। আমাদের সে ফ্যাসিলিটি এখনও ডেভলপ করেনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার জাতীয় ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা ২০০৯-২০১৫ প্রণয়ন করেছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে—সমন্বিত ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্যানসার নিরাময় কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। তবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, এমএজি ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের জন্য উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ টি এম আতিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখানে রেড ও ব্লু ইউনিট মিলিয়ে দুটি ইউনিটে মোট ৩১টি বেড রয়েছে। কিন্তু এই সিট সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ—দুই বিভাগেই ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা হয়। আন্তঃবিভাগে যাদের অবস্থা জটিল এবং যাদের কেমোথেরাপিসহ চিকিৎসকদের আওতাধীন থাকার প্রয়োজন হয়, তাদেরই কেবল ভর্তি করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ রোগীরই চিকিৎসা দেওয়া হয় বহির্বিভাগে। প্রতিদিন ওখানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসা কতটুকু রয়েছে—জানতে চাইলে জাতীয় ক্যন্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক হাবীবুল্লাহ তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সার্বিকভাবে যেমন ক্যান্সারের চিকিৎসা পুরোপুরি নেই, তেমনি শিশুদেরও নেই। তবে সম্প্রতি শিশুদের ক্যানসরা চিকিৎসায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যেমন, শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসার জন্য পৃথক বিভাগ হচ্ছে। তৈরি হচ্ছেন পৃথক বিশেষজ্ঞও। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পাশপাশি শিশু ক্যানসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদের সংখ্যা বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা শহরের হাসপাতালেও বাড়ানো উচিত।
একই প্রসঙ্গে একই হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক অনকোলজি বিভাগের প্রধান ড. মমতাজ বেগম বলেন, চিকিৎসাসেবা অবশ্যই বাড়াতে হবে।যেমন, চোখের ক্যানসারে যারা আক্রান্ত হন, তাদের রেডিওথেরাপির জন্য বিশেষ কিছু টেকনিকের দরকার হয়। ওইখানে চিকিৎসার সুযোগ আরও বাড়ানো উচিত। কেমোথেরাপির জন্য বিশেষ টেকনোলজিস্ট, অ্যানেসথেসিস্টের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এদিকটায় সরকারকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।
/এমএনএইচ/








