রাজধানীর গুলশানে অগ্রণী ভিলা লা ওপালা ভবনের পাঁচতলায় ‘অল দ্য বেস্ট’ নামে স্পা সেন্টারটির মালিক হাসানুজ্জামান ওরফে হাসান, ম্যানেজার তার স্ত্রী পায়েল। বিউটি পার্লারের কথা বলে ভাড়া নিয়ে তারা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে স্পা ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। গত বুধবার (১১ জানুয়ারি) ওই স্পা সেন্টার থেকে লাফিয়ে পড়ে তরুণীর মৃত্যুর ঘটনায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। গত দুই মাসে বিভিন্ন অভিযোগে স্পা সেন্টারটিতে পুলিশ চারটি অভিযান চালালেও শেষ পর্যন্ত কী কারণে সেটি বন্ধ হয়নি—বলতে পারছে না পুলিশ। তাছাড়া ওই স্পা সেন্টারের মালিক হাসানকে অভিযোগের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতারও করেছিল।
বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশান ২-এর ৪৭ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর ভবন ও তার আশপাশের এলাকায় অনুসন্ধান চালায় বাংলা ট্রিবিউন।
জানা যায়, স্পা সেন্টারের মালিক হাসান ৩-৪ বছর আগে ভবনটির পাঁচতলায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। স্ত্রী পায়েল সেখানে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে আসছিল। স্পা সেন্টারের আড়ালে সেখানে মূলত অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতো। আগে একাধিকবার হাসানের স্পা সেন্টারটিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করলেও অজানা কারণে সেটি বন্ধ হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা। এছাড়া প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে হাসানের ওঠাবসা থাকায় তাকে ভয়ে কিছু বলতে পারতেন না স্থানীয়রা।
গত বুধবার (১১ জানুয়ারি) থেকে গুলশানের সব স্পা সেন্টার বন্ধ রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, পুরো গুলশান থমথমে। স্পা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা যে যার মতো গাঢাকা দিয়েছেন।
‘অল দ্য বেস্ট’ নামে ওই স্পা সেন্টার সম্পর্কে জানা যায়, প্রতিদিন বেলা ১২টার পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত স্পা সেন্টারের কার্যক্রম চলতো। নিয়মিত আট-দশ জন নারীর সেখানে যাওয়া-আসা ছিল। তাদের দিয়েই হাসান ও পায়েল দম্পতি স্পা সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবসা করে আসছিল।
গত বুধবার (১১ জানুয়ারি) গুলশানে আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধে অভিযান চালালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ওই স্পা সেন্টারের সন্ধান পায়। অভিযান শুরুর একপর্যায়ে দুই তরুণী ওই ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েন। ওই ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয় এবং আরও একজন আহত হন।
সরেজমিন দেখা যায়, গুলশান ২-এর ৪৭ নম্বর রোডের পশ্চিম পাশে কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং রয়েছে। তারমধ্যে ২৫ নম্বর বাড়ি অগ্রণী ভিলা লা ওপালা। ওই ভবনের পাঁচতলায় “অল দ্য বেস্ট” নামে স্পা সেন্টার পরিচালিত হতো। ভবনগুলোর মাঝে পাঁচ-ছয় ফুট ফাঁকা জায়গা আছে। সব ভবনের আলাদা গেট। স্পা সেন্টার থাকা ভবনটি পাঁচতলা, প্রতি তলায় চারটি করে মোট ২০টি ফ্লাট রয়েছে। সবগুলোই অফিস স্পেস হিসেবে ভাড়া দেওয়া। ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। সেখান থেকেই লিফট ও সিঁড়ি দিয়ে ভবনে উঠতে হয়।
লিফটের সামনেই টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসেন ভবনের কেয়ারটেকার আব্দুল মোতালেব। ভবনটির পাঁচতলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাটে স্পা সেন্টার চলতো। পাশের ফ্ল্যাটে একটি কোম্পানির অফিস রয়েছে। স্পা সেন্টারটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তালা দিয়ে রেখে যাওয়ায় ভিতরে প্রবেশ করা যায়নি। তবে দেখা গেছে ওই ফ্ল্যাটটির সামনে রয়েছে ডিজিটাল সিকিউরিটি ব্যবস্থা। রুমের দরোজায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন আর ওপরে সিসি ক্যামেরা লাগানো।
আব্দুল মোতালেব বলেন, ভবনটিতে মোট ২০টি প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। সব অফিসেই নারী স্টাফ রয়েছেন। এই সুযোগে হয়তো বাইরের নারীরা এসে স্পা সেন্টারে কাজ করতেন। এছাড়া প্রায় সময়ই অভিযান চালায় বিভিন্ন সংস্থা। কিন্তু কীসের জন্য সেটি বন্ধ হয় না, তা বলতে পারবো না।
তিনি আরও বলেন, বুধবার ভবনটিতে অভিযান পরিচালনা করে ডিএনসিসি। অভিযানের একপর্যায়ে ভবনের পাঁচতলার স্পা সেন্টারে প্রবেশ করে। অভিযানের কথা শুনে স্পা সেন্টারে কাজ করা নারীরা পালানোর বিভিন্ন রাস্তা খুঁজতে থাকেন। এসময় ফারজানা ও আরও দুই নারী সহকর্মী ভবনের উত্তর পাশের একটি কক্ষের এসি বসানোর ফাঁকা জায়গা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন তারা দুটি ভবনের নিচের ফাঁকা জায়গায় পড়ে যান। তাদের তৃতীয় সহকর্মী নামার সময় ওই ফাঁকা জায়গায় আটকে যান। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আসার আগেই তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার ফরহাদ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা সেখানে পৌঁছালে ভবনের নিচ থেকেই জানানো হয়—আটকে থাকা নারীকে উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আমরা চলে আসি।
ভবনের প্রধান গেটের সঙ্গেই সিকিউরিটি গার্ড রুম। সেখানে বসেন সিকিউরিটি গার্ড আব্দুল্লাহ। তার পেছন দিয়ে সরু গলি দিয়ে অগ্রণী ভিলা লা ওপালা ভবনের পেছনে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের উত্তর পাশে সেপটিক ট্যাংকের ওপরে রক্তের দাগ। পাঁচতলা থেকে ওই সেপটিক ট্যাংকের ওপর পড়েন ফারজানা বেগম ও আহত রিয়া আক্তার। পুলিশ জানায়, ফারজানা নিচে পড়ে যাওয়ায় তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান। এছাড়াও ওই ঘটনায় চাঁদনী বেগম নামে আরও একজন নারী আহত হয়।
ভবনের নিরাপত্তাকর্মী আব্দুল্লাহ বলেন, ডিএনসিসির অভিযানে অংশ নেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভবনটিতে প্রবেশ করার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ওপর থেকে নিচে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে আমরা দৌড়ে যাই। ভবনের বাম পাশের নিচের খালি জায়গায় গিয়ে দেখি, পাশাপাশি দুই ভবনের মাঝে দুই নারী পড়ে আছেন। এদের মধ্যে একজনের মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল, অন্যজন গুরুতর আহত হয়ে কাতরাচ্ছিলেন। তখন কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের ধরাধরি করে নিয়ে আসে। এর প্রায় ৩০ মিনিট পর থানা পুলিশ এলে ওই দুই নারীকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরমধ্যে স্পা সেন্টার থেকে ৮-১০ জন নারীকে আটক করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।
ক্রয় সূত্রে ওই ফ্ল্যাটের মালিক ইশরাত জাহানের স্বামী হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া হাসান বিউটি পার্লারের কথা বলে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। পার্লারের ভিতর কী হতো আমার জানা নেই। তিনি বলেন, হাসানের কাছে বাসা ভাড়া ও সার্ভিস চার্জ বাবদ অনেক টাকা পাবো। তাকে আমার পাওনা শোধ করে বাসা ছেড়ে দিতে বলেছি। কিন্তু সে টাকাও দেয় না, বাসাও ছাড়ে না।
নিহত ফারজানার স্বামী জাহিদ হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফারজানা বুধবার বেলা ১১টায় খিলক্ষেতের বাসা থেকে তার বড় বোনের সঙ্গে বের হয়। পরে বিকালের দিকে জানতে পারি আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে তাকে মৃত অবস্থায় পাই। আমরা জানতাম ফারজানা বিউটি পার্লারে চাকরি করেন।
আহত চাঁদনী বেগমের স্বামী তারেক বলেন, বুধবার সকালে বাসা থেকে বের হয় চাঁদনী। রাতে বাসায় না ফিরলে অনেক খোঁজাখুঁজির পরে জানতে পারি চাঁদনী অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিক্যালে রয়েছে। আমি সিএনজি চালাই। সংসারের বাড়তি আয়ের জন্য স্ত্রী সুপার শপে কাজ করতো বলে জানতাম।’
চাঁদনীর বাবা আলমগীর হোসেন বলেন, গতকাল রাতে মেয়েকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে আসি। হাতে ব্যান্ডেজ করে রাতে বরগুনায় গ্রামের বাড়িতে চলে আসি। সে এখন ভালো আছে। মেয়ে জামাই নিয়ে ঢাকায় থাকতো। পাশাপাশি চাকরি করতো বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আসিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাসান-পায়েল দম্পতি চুরি করেই এই স্পা সেন্টার চালাতেন। স্পা চালানোর অভিযোগে তাদের নামে গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে চারটি মামলা হয়েছে। এছাড়া ওই মামলায় হাসানুজ্জামান ওরফে হাসান আগে একবার গ্রেফতার হয়, পরে জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে আসে। কিন্তু চলতি বছর আবার আদালত থেকে জামিন নিতে গেলে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। বর্তমানে হাসান জেলে আর তার স্ত্রী সাইনুর আক্তার পায়েল পলাতক।
এসআই আসিফ আরও বলেন, গুলশানের স্পা সেন্টারে অভিযানের ঘটনায় ডিএনসিসির প্রসিকিউশন অফিসার (অঞ্চল-৩) আব্দুস সালাম বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা করেছেন। ওই মামলায় তিন জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার আসামিরা হলেন—স্পা সেন্টারের মালিক হাসানুজ্জামান ওরফে হাসান, তার স্ত্রী স্পা সেন্টারের ম্যানেজার পায়েল এবং ওই ফ্ল্যাটের মালিক এটিএম মাহবুবুল আলম। ডিএনসিসি’র এজাহারে বাসার মালিক হিসেবে মাহবুবুল আলমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে বাসার প্রকৃত মালিক কে তা জানা যাবে। নিহত ফারজানা আক্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ফারজানা আক্তারের মৃত্যুর বিষয়টি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—তা তদন্তে উঠে আসবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরবাসীর চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার জন্য নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স খতিয়ে দেখা এবং আবাসিক এলাকায় বিনা অনুমতিতে কোনও ব্যবসা পরিচালনা করছে কিনা তা দেখতেই অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে দরজা খুলতে বললে ভেতর থেকে দুই তরুণী নিচে লাফ দেন। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানতে পেরে ওই দুই তরুণীকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ওই স্পা সেন্টারে অভিযান আর পরিচালনা করেননি ম্যাজিস্ট্রেট।’
জরিমানা দিয়ে মুক্ত আটকরা
গুলশানের ‘অল দ্য বেস্ট স্পা’ সেন্টার থেকে আটক ৯ জনকে পাঁচশত টাকা জরিমানা, অনাদায়ে পাঁচ দিনের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) সেই জরিমানার টাকা পরিশোধ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের হাজতখানা থেকে মুক্ত হয় তারা। সিএমএম আদালতের হাজতখানার ইনচার্জ শহীদুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আসামিদের মধ্যে এমদাদুল হক তামিম, পীযুষ কান্তি রায় ও মুশফিকুর রহমানের নাম জানা গেলেও বাকি ছয় নারীর নাম জানা যায়নি।
আরও পড়ুন:









