অমর একুশে বইমেলা-২০২৩ গড়িয়েছে শেষার্ধে। মেলার তৃতীয় শুক্রবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পাঠক-লেখকের আড্ডায় মেলা প্রাঙ্গণ ছিল সরগরম। এই দিন মেলার দ্বার খোলে সকাল ১১টায়। ‘শিশুপ্রহর’ পেরিয়ে বিকাল গড়াতেই মেলায় বাড়তে থাকে পাঠক-দর্শনার্থীদের আগমন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে জনসমাগম।
মেলার ১৭তম এই দিনে পাঠক সমাগমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছিল লেখকদেরও সমাগম। পেশাজীবী লেখক ছাড়াও মেলায় এদিন আসেন বিভিন্ন সেলেব্রিটি লেখকও। মেলার বিভিন্ন স্টল-প্যাভিলিয়নে পছন্দের লেখকদের বই কিনে তাদের অটোগ্রাফ সংগ্রহে ছিল ভক্তদের ভিড়। কেউ কেউ আবার সেলফি তুলতেও ছিলেন ব্যস্ত। কোথাও কোথাও আবার সিরিয়াল দিয়ে নিতে হয়েছে অটোগ্রাফ।
লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পছন্দের লেখকের অটোগ্রাফ সংগ্রহ ও সেলফি তুলতে পেরে খুশি পাঠকরাও। পাঠকদের এমন আগ্রহ ও তাদের সাথে সময় কাটাতে পেরে খুশি লেখকরাও। মোহাম্মদপুর থেকে মেলায় আসা শাহরিয়ার আহমেদ নামে এক দর্শনার্থী বলেন, ‘মেলায় গত শুক্রবারে এসেও কিছু বই কিনেছি। আজ আমার পছন্দের লেখক মিজানুর রহমান আসবেন জানতে পেরে আবারও এলাম, তার অটোগ্রাফ নিতে, দেখা করতে। অনেক ভিড় ঠেলে মেলায় ঢুকে দেখি এখানেও সিরিয়াল। লাইনে দাঁড়িয়ে অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেছি, সেলফিও তুলেছি- এটাই শান্তি।’
মেলা প্রাঙ্গণেই কথা হয় লেখক সোহেল রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বই মেলা মূলত লেখক-পাঠকদের আড্ডার অন্যতম একটি উৎসব। আর আজকে সেই উৎসবটা খুব ভালোভাবে হচ্ছে, দেখতে ভালো লাগছে। এটির সবচেয়ে বড় ভালো লাগার জিনিস হলো- নিজের পাঠকদের সাথে সৌহার্দ্য বিনিময়।’
ছিল সবচেয়ে বেশি বিক্রি
কাগজের দাম বাড়ায় এ বছর বইয়ের দামও বেড়েছে। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল এ বছর বই কম কিনবেন পাঠকরা। কিন্তু সেই তুলনায় বেশ ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। প্রকাশকদের অনেকেই জানিয়েছেন, ১৭তম দিনে এসে এবারের বইমেলায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি করেছেন তারা। এতে তাদের মুখে হাসি ফুটেছে।
প্রকাশক ও বিক্রয়কর্মীদের আশা, পাঠকের বই কেনার আগ্রহ এভাবে বাড়তে থাকে, তবে লোকসানের যে শঙ্কা ছিল সেটি কাটিয়ে ওঠা যাবে। নালন্দা প্রকাশের স্বত্বাধিকারী রিয়াজ আলম বলেছেন, ‘পাঠকের বই কেনার আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এভাবে যদি বাড়তে থাকে তাহলে প্রকাশকরা লোকসান এড়িয়ে লাভ করতে পারবো।’
অবসর প্রকাশের বিক্রয়কর্মী নাহিদ হাসনান বলেন, ‘বইমেলায় এবারের সবচেয়ে বেশি ভিড় আজকে, একই সঙ্গে বিক্রিও। আশা করছি সামনে আরও বাড়বে, প্রকাশকদের শঙ্কা কাটবে।’
নতুন বই
১৭ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলার ১৭তম দিনে নতুন বই এসেছে ২৭৬টি। এরমধ্যে গল্পের বই ৩৫টি, প্রবন্ধ ১২টি, উপন্যাস ৪৪টি, কবিতার বই ৮২টি, গবেষণা আটটি, ছড়া পাঁচটি, শিশুসাহিত্য তিনটি, জীবনী ৯টি, রচনাবলি দুটি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ১২টি, নাটক ছয়টি, বিজ্ঞান বিষয়ক তিনটি, ভ্রমণ বিষয়ক ছয়টি, ইতিহাস ছয়টি, রাজনীতি বিষয়ক আটটি, চিকিৎসা বিষয়ক একটি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চারটি, রম্য তিনটি, ধর্ম বিষয়ক তিনটি, অনুবাদ দুটি, ফিকশন ছয়টি ও অন্যান্য ১৬টি।
ছুটির দিনের আয়োজন
মেলায় এদিন শিশুপ্রহর ছিল সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত। সকাল ১০টায় বইমেলার মূলমঞ্চে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। ক-শাখায় প্রথম হয়েছে আরোহী বর্ণমালা, দ্বিতীয় হয়েছে অংকিতা সাহা রুদ্র এবং তৃতীয় হয়েছে জুমানা হোসেন। খ-শাখায় প্রথম হয়েছে সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ, দ্বিতীয় হয়েছে আনিশা আমিন এবং তৃতীয় হয়েছে অদ্রিতা ভদ্র। গ-শাখায় প্রথম হয়েছে আদিবা সুলতানা, দ্বিতীয় হয়েছে তাজকিয়া তাহরীম শাশা এবং তৃতীয় হয়েছে সিমরিন শাহিন রূপকথা। বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন আবৃত্তিশিল্পী গোলাম সারোয়ার, দেওয়ান সাঈদুল হাসান এবং ড. শাহদাৎ হোসেন নিপু। প্রধান অতিথি ছিলেন আবৃত্তিশিল্পী প্রজ্ঞা লাবণী।
আলোচনা অনুষ্ঠান
বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্মশতবার্ষিকী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহীবুল আজিজ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অনিরুদ্ধ কাহালি ও মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আকরম হোসেন।
প্রবন্ধ পাঠকালে মহীবুল আজিজ বলেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার সমকালীন জাতীয়তাবাদী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। যে তিনটি প্রধান উপন্যাস তিনি রেখে গেছেন সেগুলোর মুখ্য অন্বেষা দেশ, দেশের সামগ্রিক চিত্র এবং পারিবারিক-সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির সুন্দর বিশ্লেষণ। শুধু তাই নয়, এমন উপন্যাসও তার রয়েছে যেখানে পাওয়া যায় দৈশিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বিশদ চিত্র। ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসের চরিত্র, সংলাপ, কাহিনি এবং বর্ণনার অন্তরালে নিহিত থাকে অন্তর্বাস্তবের এমন ইঙ্গিত, যা কখনও প্রত্যক্ষ এবং কখনও প্রতীকী।
অনুষ্ঠানে আলোচকরা বলেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার সমকালীন সমাজচিত্র ও মানবচরিত্রকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই মানবজীবনের অনিশ্চয়তা, ভয়, অস্তিত্বের সংকট সবকিছুই তার রচনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বর্ণনাশৈলী ও ভাষা উপস্থাপনা বিশেষভাবেই স্বতন্ত্র। বাংলা সাহিত্যের গল্প, উপন্যাস ও নাটক প্রতিটি ক্ষেত্রেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সৃষ্টিকর্ম যেমন ক্রমান্বয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে, তেমনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হয়ে উঠছেন আরও বেশি সমসাময়িক।
সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ আকরম হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকে বিচার করা এখন সময়ের দাবি। তার সাহিত্য-বিশ্লেষণে তত্ত্বের শৈল্পিক ও নান্দনিক ব্যবহারের দিকে আমাদের মনোযোগী হতে হবে।
লেখক বলছি
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন মাসুদুজ্জামান, ভাগ্যধন বড়ুয়া, ম্যারিনা নাসরিন ও ইউসুফ মুহম্মদ।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন ফরিদ আহমদ দুলাল, ফেরদৌস নাহার, তপন বাগচী, জাহিদ মুস্তাফা, আফরোজা সোমা ও আশরাফ জুয়েল। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী সুকান্ত গুপ্ত, রুবিনা আজাদ ও মো. শওকত আলী। এছাড়া ছিল ফরিদ আহমদ দুলাল রচিত এবং নাট্যাঙ্গন নাট্যপরিবার নিবেদিত নাটক ‘উন্মোচন রহস্য’ এবং রুবিনা আজাদের পরিচালনায় ‘উদয় দিগঙ্গন’-এর শিল্পীদের পরিবেশনা।
১৮তম দিনের সময়সূচি
আগামীকাল শনিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) অমর একুশে বইমেলার ১৮তম দিনে মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় শিশুপ্রহর চলবে। সকাল ১০টায় বইমেলার মূলমঞ্চে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন গোলাম মুস্তাফা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মোহিত কামাল ও রাজীব কুমার সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সুব্রত বড়ুয়া।









