প্রথম আলোর প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে দেশে একটি প্রেক্ষাপট সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনরা। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে তা প্রথমে প্রেস কাউন্সিলকে অবগত করতে হবে বলেও দাবি করেন তারা।
তারা বলেন, প্রেস কাউন্সিলকে আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে শক্তিশালী করে তুলতে হবে এবং এই কাউন্সিল থেকে অভিযুক্ত সাংবাদিকের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শনিবার (১ এপ্রিল) রাজধানীর বনানীর ঢাকা গ্যালারিতে এডিটরস গিল্ড আয়োজিত ‘সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় এসব কথা বলেন তারা। এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু গোলটেবিল বৈঠকটির সঞ্চালনা করেন।
বৈঠকের শুরুতে দৈনিক আমাদের নতুন সময়ের ইমেরিটাস সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন নিয়ে যদি আলোচনা করতে থাকি, তাহলে তা কনভেন্সিং করবে না। কারণ একটি রিপোর্ট, একটি বিভ্রান্তি, একটি সংশোধন বিষয়টির সমাপ্তি ঘটায়। কিন্তু এটা একটা প্রবণতা। এই প্রবণতা দেখতে ১/১১-এর ৩০ মাসের বিভিন্ন পত্রিকার একটি জরিপ করেছিলাম। সেখানে কন্টেন্ট অ্যানালাইসিস করে দেখেছি প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের কলাম হোক, মতামত হোক, এ রকম সাজিয়ে সাজিয়ে একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়। এখন এই পেক্ষাপটে এসে প্রথম আলো হয়তো খুন করে না। কিন্তু কেউ না কেউ করে। বঙ্গবন্ধুর সময় জাল পরানোর ছবি, সেখানে আফতাব সাহেব তো ক্যু করে নাই। যারা ক্যু করবে, নৃশংসতা করবে, তারা ওই প্রেক্ষাপটের সুবিধা নেয়।
নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, আজ শেখ হাসিনা আন্ডার রিয়েল থ্রেট এবং ওই রকম প্রেক্ষাপট আবার তৈরি হচ্ছে। এখনও কন্টেন্ট অ্যানালাইসিস করে দেখা যাচ্ছে, আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্মাণ করার প্রয়াস চলছে। সুতরাং এটাকে দেখতে হবে টিপ অব দি আইসবার্গ অথবা প্রবণতার একটি পয়েন্টের ইস্যু হিসেবে। এটাকে একটা স্টোরি হিসেবে দেখলে তা মিসলিডিং হবে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, সংবাদপত্রে কোনও ভুলত্রুটি হলে এটা যাবে প্রেস কাউন্সিলে। কিন্তু রাতে অ্যারেস্ট করা কোনও আইনে গ্রহণ করে না। এই যে একটা প্র্যাকটিস, আইনের অপব্যবহার, এটা বরাবর হয়ে আসছে। শামসকে শুধু গ্রেফতার করা হয়নি, আমি মনে করি যারা সংবাদিক আছেন, সবার ভেতরে একটা আতঙ্ক আছে কমবেশি। আজ হোক কাল হোক, আমরা এটার ভিকটম হতে পারি।
প্রেস কাউন্সিল আইনের পরিবর্তন আনা দরকার মন্তব্য করে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হচ্ছে, সেগুলো প্রথমে প্রেস কাউন্সিলে আসা উচিত। সেখানে যাচাই করে দেখা যায় যে এটা অপরাধযোগ্য কি না। তখন যে আদালতে যে অফেন্স, প্রেস কাউন্সিল থেকে সেগুলো সেই আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বাকিগুলো প্রেস কাউন্সিল বিচার করবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কিছু বলার আগে আমাদের কাছে আবেদনের মতো আসতে হবে।
সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার ও আজকের পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান বলেন, যদি সংবাদকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তার মোটিভ সম্পর্কে মানুষ, পাঠক বা শ্রোতা-দর্শক সন্দেহাতীতভাবে প্রশ্ন তুলতে পারে। এই সংবাদের (প্রথম আলোর) উৎসটা কী? এর শানেনুজুলটা কী? নিশ্চয় স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে সংবাদটি প্রকাশ করার একটি উদ্দেশ্য আছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে আমরা প্রতিদিনই লিখছি, সংবাদ বের হচ্ছে, মানুষজন জানে। এই যে বিশ্বজুড়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে হাহাকার, সেই তুলনায় বাংলাদেশ অনেক ভালো অবস্থানে আছে।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি হচ্ছে যারা নেট ব্যবহার করবে, তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই আইনের এমন কিছু ধারা-উপধারা রয়েছে, যেগুলোর অপব্যবহার হচ্ছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জনগণকে বিভ্রান্ত ও নাজেহাল করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ব্যবহারটাকে সীমিত করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, যদি একজন নাগরিক সাইবার ক্রাইমে আরেকজনের দ্বারা আক্রান্ত হন, সেটাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। যদি মিডিয়ার বিষয় থাকে, তাহলে আমাদের প্রেস কাউন্সিল আছে, সেটাকে শক্তিশালী করতে হবে, তাদের অনুমতি নিয়ে মামলা হোক, আটক হোক। ফৌজদারি মামলা হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। আর ডিজিটাল আইন নিয়ে জাতিসংঘ যা-ই বলুক, জাতিসংঘের বাস্তবতা…আজ আমেরিকা কি ব্যবস্থা গ্রহণ করে না?
সাবেক তথ্য কমিশনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, স্বাধীনতা দিবসে এ রকম একটা নিউজ আইটেম করা হলো, যেটা কিনা ষড়যন্ত্রমূলক বলা যায়। আমি মনে করি স্বাধীনতা দিবসে এ রকম একটা নিউজ যখন করা হয়, সেটা হালকা করে দেখা উচিত নয়।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা থেকে কোনও সংবাদ প্রকাশের আগে অবশ্যই বিবেচনা করা দরকার যে পরবর্তী কী পরিস্থিতি তৈরি হবে। সে জন্য সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশে যেন কোনও ভুল না হয়, এ জন্য আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সমস্যা আছে। আমরা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে প্রতিবাদ করি। শামসকে মাঝরাতে তুলে নেওয়ার প্রতিবাদ করি। আমরা মনে করি এগুলো সাংবাদিকতার সংকট। একই সঙ্গে সাংবাদপত্রের বেকআপ নিয়ে কেউ কোনও পলিটিক্যাল এজেন্ডা করে, তখন আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়।
আর্টিকেল-১৯-এর পরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া) ফারুক ফয়সাল বলেন, এখন ভয় দেখানোর যে সংস্কৃতি চলছে সমাজে, এই ডিজিটাল অ্যাক্টের কারণে অনেক সাংবাদিক অনেক কথা বলে না। অনেক মানুষই অনেক কথা বলে না। আগের দিনে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ছিল না, তখন একটা খবর মিথ্যা হতো, সরকারের বিরুদ্ধে যেতো, জনস্বার্থে আঘাত করতো, সরকার প্রেস নোট দিতো। একটা খবর কারও কাছে পছন্দ না হলে সে প্রতিবাদ করতো, খবরের কাগজ সে প্রতিবাদ ছাপতে বাধ্য ছিল এবং নিচে ব্যাখ্যা দিতে হতো কোথা থেকে তারা এই খবর পেল। এই সংস্কৃতিটা উঠে গেছে। এখন প্রতিবাদের আর কোনও সংস্কৃতি নেই। এখন কিছু হলে ডিজিটাল অ্যাক্টে মামলা দেয়।









