বিশেষ শিশুকে সাধারণ স্কুলে ভর্তি করাতে কেন অনীহা অভিভাবকদের

আতিক হাসান শুভ
০২ এপ্রিল ২০২৩, ১০:০০আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৩, ১৫:২৮

সাধারণ স্কুলগুলোতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা কোনও সুযোগ-সুবিধা না থাকায় সেখানে ভর্তি করাতে অনীহা দেখায় অভিভাবকরা। অটিজমে আক্রান্ত শিক্ষার্থীকে জানার বা বোঝানোর মতো প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে নেই কোনও শিক্ষক। এমনকি সরকারিভাবেও এনিয়ে কোনও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলে সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা। এছাড়া শিক্ষকদের আন্তরিকতার অভাব থাকার অভিযোগও করেছেন অভিভাবকরা।

বিশেষজ্ঞরা জানান, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যাকে অটিজম বলে থাকে। অটিজমে আক্রান্তদের বলা হয় অটিস্টিক শিশু, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা বিশেষ শিশু (স্পেশাল চাইল্ড)। এ সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ, সামাজিক আচরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে অংশগ্রহণে বেশ প্রতিবন্ধকতা লক্ষ করা যায়।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণ স্কুলগুলোতে বিশেষ ছেলে-মেয়েদের জন্য কোনও সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে এসব স্কুলে তাদের বাচ্চাদের ভর্তি করানো হয় না। পুরান ঢাকার বাসিন্দা হুমাইরা ইয়াসমিন নামে একজন অভিভাবক জানান, আমার ছেলে বাক-প্রতিবন্ধী। গতবছর আমি আমার বাচ্চাকে একটা প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য নিয়েছি। সেখানকার শিক্ষক আমাকে বলেন, দেখুন আপনার বাচ্চা তো স্পেশাল চাইল্ড, আমার মনে হয় এই রিলেটেড কোনও স্কুলে ভর্তি করালে ভালো হবে। কারণ ওকে বোঝানোর মতো কোনও শিক্ষক আমাদের স্কুলে নেই। এখন আমি থাকি এখানে, আমি বাচ্চাকে নিয়ে কোথায় যাবো?

আক্ষেপ নিয়ে এই অভিভাবক আরও বলেন, আশেপাশের সাধারণ যেই স্কুলেই নিয়েছি কেউ সরাসরি এটা বলেনি যে ভর্তি করাবে না। তবে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেছে যেন আমি এখানে না ভর্তি করাই। প্রতিবন্ধীদের জন্য সাধারণ স্কুলগুলোতে নেই কোনও অভিজ্ঞ শিক্ষক। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কীভাবে দেখা-শোনা করতে হয় তা কেউ জানে না। ফলে এসব স্কুলে ভর্তি করালে কিছু দিন পর শিক্ষকদের অবহেলা বা অযত্নের কারণে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে হয়। সব সাধারণ স্কুলে যদি ইশারা ভাষা জানা একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক থাকতো তাহলে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সাথে কথা বলা সহজ হতো বা তাদের সুবিধা-অসুবিধা সহজে জানা যেতো। সাধারণ স্কুলগুলোতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সুবিধার্থে ব্রেইল পদ্ধতিতে পাঠদান এখন সময়ের দাবি।

নিলুফার চৌধুরী নামে আরেকজন অভিভাবক বলেন, একজন ব্যাংকার হওয়ায় একেকবার একেক জায়গায় বদলি হই। আমার ছেলেটা একটু কম বোঝে। বলতে পারেন বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী। আমি প্রথমে আমার বাসার কাছের একটা স্কুলে ওকে ভর্তি করাতে যাই। স্কুল থেকে বলা হয় স্পেশাল চাইণ্ডের জন্য তাদের কোনও শিক্ষক নেই। আপনার বাচ্চাকে দেখভাল করবে কে। ভর্তি করানো লাগবে না, আপনি এমনিতেই ওকে কয়েকদিন নিয়ে আসেন। কী করা যায়—আমরা তারপর দেখবো । শিক্ষকরা কেমন যেন উদাসীন একটা মনোভাব দেখালো। পরে আমি উপায় না দেখে এখন তাকে গেণ্ডারিয়া বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের পড়াশোনা ও ভর্তির বিষয়ে পুরান ঢাকার মুসলিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুমা চৌধুরী বলেন, অটিজমে আক্রান্ত শিশুর জন্য প্রত্যেক স্কুলে একটু বিশেষ ব্যবস্থা রাখা উচিত। যেখানে তারা পড়াশুনা-খেলাধুলাসহ অন্যান্য সকল বিষয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাবে। সত্যি বলতে এই স্কুলটিতে পড়ার পরিবেশ নেই। শিক্ষার্থীদের ঠিক মতো বসার জায়গা নেই, ক্লাসের জায়গা নেই, ওয়াশরুম নেই, নিরাপদ পানি নেই। এটা নামেমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যেখানে স্বাভাবিক নিয়মে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয় সেখানে অটিস্টিক শিশুদের কীভাবে বিশেষভাবে খেয়াল করবো? এজন্য এই স্কুলে কোনও অভিভাবক তাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে ভর্তি করায় না।

ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল তাজেরীন বলেন, সাধারণ স্কুলগুলোতে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কোনও বিশেষ ধরনের সুযোগ-সুবিধা না থাকায় তাদের অভিভাবকরা চায় প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে তাদের সন্তানদের পড়াশোনা করাতে। সরকারিভাবে যদি সাধারণ স্কুলগুলোতে প্রতিবন্ধীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে অভিভাবকরা আগ্রহী হবে। এমনিতে অভিভাবকরাও শঙ্কায় থাকে তাদের বাচ্চাদের ঠিক মতো খেয়াল রাখা হয় কি না। আমাদের এই স্কুলেও শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আছে। আমাদের শিক্ষকরা সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করেন তাদের যেন কোনও অসুবিধা না হয়। এখানে দৃষ্টি, বাক বা শ্রবণ প্রতিবন্ধী কেউ আসলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা অন্যান্য সুবিধা না থাকার কারণে ভর্তি করানোর ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে না।

সরকারি দৃষ্টি ও বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ শাইখ সাজ্জাদ বলেন, অটিজম সাধারণ পাঁচ ধরনের হয়—১. ক্লাসিক্যাল অটিজম ২. এসপারজারস সিনড্রোম ৩. পারভেসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার ৪. রেট সিনড্রোম ৫. সিডিডি বা চাইল্ডহুড ডিসইন্টারোগেটিভ ডিসঅর্ডার। এই পাঁচ ধরনের অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের বৈশিষ্ট্যও নানান ধরনের। আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত শারীরিক, বুদ্ধি, দৃষ্টি, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের মুখোমুখি হতে হয়। শিক্ষকদের মধ্যে যদি এ সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে ভালো ধারণা থাকে তাহলে সাধারণ স্কুলে বিশেষ শিশুদের শিক্ষাগ্রহণে আর কোনও ব্যাঘাত ঘটবে না।

সাধারণ স্কুলে শিক্ষক ও অন্যান্য সংকট সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই কোনও না কোনও সংকট বা সমস্যা আছে। এখন এটাকে অজুহাত দেখিয়ে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ স্কুলে ভর্তি না নেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এই ক্ষেত্রে সাধারণ স্কুলের শিক্ষকদের হীনমানসিকতাকে দায়ী করেন এ শিক্ষক। আমাদের স্কুলের ভবনও তো পুরোনো। মাত্র ৭ জন শিক্ষক দিয়ে পুরো স্কুল চলছে। মোট ৪৪ পদ থাকলেও মাত্র ১৯-২০ জনের মতো জনবল রয়েছে। আরও কতো সমস্যা তার শেষ নেই। তাই বলে এসব সীমাবদ্ধতার অজুহাতে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ানোটা ঠিক মনে করি না।

/এমএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম