দুই বছর আগে রাজধানীর গুলশানে ঝিলিক আলম নামের এক নারীকে হত্যা করেন তার স্বামী সাকিব আলম মিশু। হত্যার পর সাজানো হয় সড়ক দুর্ঘটনার নাটক। শেষমেশ হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন ঘাতক স্বামী সাকিব আলম মিশু। এক বছর আগে এ মামলার তদন্ত শেষে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। তবে এখনও বিচার শুরু হয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ঝিলিকের মা তাহমিনা হোসেন আসমা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত মেয়ে হত্যার বিচার ছাড়বো না।’
২০২১ সালের ৩ এপ্রিল তাকে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সড়ক দুর্ঘটনায় ঝিলিক মারা গেছে বলে নাটক সাজানো হয়। কিন্তু হত্যার ঘটনাটি ফাঁস হয়ে যায়। পরে ঝিলিকের মা তাহমিনা হোসেন আসমা গুলশান থানায় বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার পর ঝিলিকের স্বামী সাকিব আলম মিশু, শ্বশুর জাহাঙ্গীর আলম, শাশুড়ি সাঈদা আলম, দেবর ফাহিম আলম এবং টুকটুকিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ মামলায় ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল মিশুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর আদালত। এছাড়া অপর চার আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরবর্তী সময়ে একই বছরের ৮ এপ্রিল আসামি মিশুর ফের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে ১১ এপ্রিল আসামি মিশুকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ। ওইদিন মিশু হত্যার দায় স্বীকার করে। আদালত মিশুর জবানবন্দি রেকর্ড করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি গুলশার থানার উপপরিদর্শক সুজন চন্দ্র দে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। বর্তমানে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এ বিচারাধীন রয়েছে। আগামী ৩১ মে এ মামলার অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঝিলিক তার স্বামী মিশুর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়ে সন্দেহ করতেন। ঘটনার দিন মিশু বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে না গিয়ে বাসায় ফিরে আসেন। রাত ২টার দিকে ঝিলিকের পাশেই শুয়ে পড়েন মিশু। ঘুমের মধ্যেই ঝিলিক বলতে থাকেন, ‘তুমি মেয়ে নিয়া ঘুরতে গেছিলা।’ মিশু তখন তার মাথার নিচের দুইটি বালিশ নিয়ে ঝিলিকের মুখে চেপে ধরেন। প্রায় এক মিনিট ধরে চেপে রাখার পর ঝিলিকের মুখ থেকে কথা বন্ধ হয়ে যায়। মিশু ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে মায়ের ডাকাডাকিতে মিশুর ঘুম ভাঙে। এরপর তার মা ঝিলিকের দেখেন, ঝিলিকের শরীর একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। মিশু তার ম্যানেজারের সহায়তায় ঝিলিককে গাড়িতে তোলেন। গাড়ির পেছনের সিটে ঝিলিককে শুইয়ে রাখা হয়। হাতিরঝিলে আসার সময় গাড়িটি রোড ডিভাইডারে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনা ঘটে। এরপর ঝিলিককে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান যে, আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
মামলার বাদী ঝিলিকের মা তাহমিনা হোসেন আসমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই বছরেও আমার মেয়ে হত্যার বিচারের কিছুই হয়নি। এ মামলার কোনও তদন্তই হয় নাই। অন্য আসামিদের বাদ দিয়ে চার্জশিট দেয় পুলিশ। এটার বিরুদ্ধে নারাজি দিলে সেটা গ্রহণ করা হয়নি। আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত মেয়ে হত্যার বিচার ছাড়বো না।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এ দেশের আইন কি আইনের কাজ করে। চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়েছি। কিন্তু আদালত সেটা গ্রহণ করেনি। কেন যে আদালত পুনরায় তদন্ত দিল না আমার জানা নেই। এ আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আপিল করেছি। আমি আবার তদন্ত চাই। এ তদন্ত আমি মানি না।’
পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালে মিশুর সঙ্গে ঝিলিকের বিয়ে হয়। শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর ও তার স্ত্রী আমার মেয়েকে দেখতে পারতো না। তারা অনেক হিংসা করতো। তারাই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন। ঝিলিকের বাবা মারা যাওয়ার এক বছর না হতেই তাকে হারিয়েছি।’
মামলার আইনজীবী মো. ফয়সাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চার্জশিট থেকে কয়েকজনকে বাদ দেওয়ার কারণে বাদীর একটা রিভিউ চলছে। রিভিউ হয়ে গেলেই মামলার চার্জ গঠন করা হবে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সুজন চন্দ্র দে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি চার্জশিট দিয়েছি, আদালত চার্জশিট গ্রহণ করেছে। এখন বাকিটা বিজ্ঞ আদালতের ব্যাপার।’
আসামিদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তদন্ত করে যা পেয়েছি, তাই দিয়েছি। তদন্ত করতে গিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও পরামর্শ করেছি। তদন্তে যা খুঁজে পেয়েছি (প্রতিবেদনে) তাই দিয়েছি।’









