বছর ঘুরে আবারও আসছে পহেলা বৈশাখ। বাংলা বছরের প্রথমদিন। নববর্ষে আবহমান বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি হালখাতা। পুরনো হিসেব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন বছরে নতুন খাতায় নাম তোলাই হলো হালখাতা। তবে কালের বিবর্তন ও প্রযুক্তির উৎকর্ষে ভাটা পড়েছে হালখাতা সংস্কৃতিতে। ব্যবসায়ী মহলে হালখাতার রেওয়াজ থাকলেও তা আর আগের মতো জৌলুসপূর্ণ নয়। যার প্রভাব পড়েছে কার্ড ব্যবসায়ীদের মধ্যেও।
রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হালখাতার মৌসুম এগিয়ে আসলেও ব্যস্ততা নেই কার্ডের দোকানগুলোতে। বিয়ের কার্ড বানাতেই তাদের যতটুকু ব্যস্ততা। কিছু কিছু দোকানে দু-একটা হালখাতা কার্ডের অর্ডার থাকলেও সিংহভাগ দোকানেই নেই কার্ডের চাহিদা।
কার্ড ব্যবসায়ীরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে কমছে হালখাতার নিমন্ত্রণ কার্ডের কদর। বছর দশেক আগেও হালখাতার কার্ডের চাহিদা ছিল তুঙ্গে। ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ কার্ড বানাতে আসতেন বাংলাবাজারে। কিন্তু এখন হালখাতার চলও কমছে, কমছে কার্ড বানানোর ঐতিহ্যও।
আজাদ প্রোডাক্টসের শাখা ব্যবস্থাপক আশিষ চক্রবর্তী বলেন, ‘রোজার ভেতর পহেলা বৈশাখ আসছে। এটার কারণে হালখাতার কার্ডের চাহিদা কম সত্যি। তবে এখন আর আগের মতো চাহিদা আসে না হালখাতা কার্ডের। বিয়ের কার্ড নিয়েই আমাদের যত ব্যস্ততা। এই মৌসুমটায় শ্যামবাজারের পান, সুপারি, আলু, পেঁয়াজ, রসুন আড়তদাররা, শাঁখারী বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা হালখাতা কার্ডের অর্ডার দিতেন৷ কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কার্ডের অর্ডার সীমিত।’
বাঙালি সংস্কৃতি অনুযায়ী, বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে এ দিন হিসাবের নতুন খাতা খুলতে এ হালখাতার আয়োজন করেন। এজন্য ক্রেতাদের বিনীতভাবে পাওনা শোধ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় ‘শুভ হালখাতা কার্ডে’র মাধ্যমে। হালখাতার কার্ডের মাধ্যমে ওই বিশেষ দিনে দোকানে আসার নিমন্ত্রণ জানানো হয়।
মেঘলা কার্ড সেন্টারের স্বত্বাধিকারীরা রহমতুল্লাহ বাঙালী বলেন, ‘আগে একটা সময় ছিল ব্যবসায়ীরা তিন-চার হাজারও কার্ড ছাপাতেন। আমরা অর্ডার নিয়ে সামলাতে পারতাম না। বিভিন্ন ডিজাইনের কার্ড নিতেন তারা। তবে যিনি আগে তিন-চার হাজার নিতেন, এখন তিনি তিন-চারশ কার্ড নিচ্ছেন। রোজা তো আছেই। রোজা না থাকলেও যে কার্ডের অর্ডার থাকবে এমন না। একটা সময় এটা সিজনাল ব্যবসা ছিল। এখন সেটা নেই।’
বিভিন্ন ধরনের পণ্যের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কার্ডের জায়গা দখল করেছে মুঠোফোন। এখন মুঠোফোনে হালখাতার নিমন্ত্রণ দেন অনেকে। এছাড়াও মোবাইল ব্যাংকিয়ের বদৌলতে সহজে টাকা পরিশোধ করেন ক্রেতারা। ফলে ছোটো-ছোটো লেনদেন সারা বছরই হতে থাকে। শুধু বড় লেনদেনে হালখাতার নিমন্ত্রণ কার্ড দেওয়া হয়। ফলে কমেছে হালখাতার প্রসারও।
শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী সাফিক হাসান বলেন, ‘যাদের বাকি দেওয়া হয়, কথা দেওয়া থাকে অমুক দিন টাকা দেবে। আমরা ফোন দিয়ে বিকাশে, নগদে, ব্যাংকে টাকা নিয়ে নেই। নির্দিষ্ট তারিখে না দিতে পারলে পরে আরেকটা তারিখে দেয়। আগে মানুষের যোগাযোগ হতো না। এখন যোগাযোগ সহজ, লেনদেনও সহজ। দেনার টাকা তো সারাবছরই ওঠে। তাহলে তো আর হালখাতা অনুষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না।’
শাঁখারীবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিপুল রায় বলেন, ‘এখন ফোন দিয়েই টাকা চাওয়া যায়। তারপরও অনেকের বড় লেনদেন থাকে। তাদের জন্য হালখাতা করা হয়। এত বছরের রীতি, এত সহজে তো বাদ দেওয়া যায় না। আবার মানুষের যা ব্যস্ততা! অনেক সময় দেখা যায়, হালখাতার দিন আসে না। একারণে যাদের না বললেই না তাদের কার্ড দিয়ে হালখাতার নিমন্ত্রণ দিয়ে মিষ্টিমুখ করাই।'
ছবি: প্রতিবেদক।









