সবুজবাগে গৃহবধূ তানিয়া হত্যা

পুলিশ বলছে ‘ডাকাতির শিকার’, পরিবারের ‘নারাজি’

মহিউদ্দিন খান রিফাত
২০ এপ্রিল ২০২৩, ০৯:২৫আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৩, ১০:৩৪

রাজধানীর সবুজবাগ এলাকার বেগুনবাড়িতে একটি ফ্ল্যাটে গত বছরের ২৬ মার্চ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন গৃহবধূ তানিয়া আফরোজ। ঘটনার সময় বাসায় তানিয়া তার ৩ বছর ও ১০ মাস বয়সী দুই মেয়েকে নিয়ে ছিলেন। আর তার স্বামী একটি মেডিক্যাল কলেজের টেকনিশিয়ান ময়নুল ইসলাম ছিলেন ফরিদপুরে তার কর্মস্থলে।

পুলিশ বলছে, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) মেকানিক সেজে বাসায় ডাকাতির সময় বাধা দিলে তানিয়া আফরোজকে হত্যা করা হয়। চাপাতি দিয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা। এ হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর তিন জনকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয়। আসামিরা হলো রিফাত আলম বাপ্পী, মো. রুবেল ফকির ও মো. সুমন হোসেন।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, আসামি বাপ্পি অভাবের কারণে ঋণ নেওয়ার চিন্তা করে। বিষয়টি নিয়ে সে তার বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করছিল। তবে আরেক আসামি রুবেল তাকে ঋণ না নিয়ে ডাকাতির পরামর্শ দেয়। পরবর্তী সময়ে তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী ডাকাতি করতে গিয়ে তানিয়া আফরোজকে হত্যা করে। হত্যার সময় তানিয়ার দুই সন্তানের মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে দেয় তারা। ঘটনার পরদিন তার স্বামী ময়নুল ইসলাম সবুজবাগ থানায় মামলা করেন।

গত ১৬ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রাজধানীর সবুজবাগ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকর জালাল উদ্দিন মাহমুদ তিন জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৯৪/৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে পুলিশের দেওয়া চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজির আবেদন করা হয়েছে। এ মামলার ভিকটিম তানিয়ার মা নাজনিন আক্তার মর্জিনা আদালতে এ আবেদন করেন।

আবেদনে তিনি অভিযোগের তির ছোড়েন মামলার বাদী ও তানিয়ার স্বামী ময়নুলের দিকেই। এই নারীর অভিযোগ, তার জামাতা ময়নুল ইসলামের আরেক স্ত্রী ছিল স্বপ্না বেগম। তার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। তবে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি তাদের ‘পথের কাঁটা’ পরিষ্কার করার জন্যই বাসায় এসির মিস্ত্রির ডাকাতির নাটক সাজানো হয়েছে। আর তানিয়া আফরোজাকে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মামলাটির নারাজির আবেদন গ্রহণ করে অন্য কোনও তদন্তকারী সংস্থাকে দিয়ে অধিকতর তদন্ত করলে হত্যার রহস্য উন্মোচন হবে বলে মনে করেন তিনি।

রাজধানীর সবুজবাগ থানায় এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পরই প্রথমে আসামি বাপ্পীকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যমতে আসামি রুবেল ও হৃদয়কে গ্রেফতার করা হয়। এ মামলায় তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বর্তমানে তারা কারাগারে আটক রয়েছে।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, ঋণ না নিয়ে ডাকাতির পরিকল্পনা করে তারা। আসামি রিফাত আলম বাপ্পী ২০২২ সালের ২০ মার্চ আসামি হৃদয়কে ঋণ নেওয়ার কথা বলে। গত ২৪ মার্চ রাতের বেলায় বাপ্পী তার বাসার সামনে ব্রিজের ওপর আসামি হৃদয় এবং রুবেলকে নিয়ে বসে। বাপ্পী ঋণের কথা তুললে রুবেল বলে, ‘ঋণ তুলে কী করবি? তুই যেখানে কাজ করিস (এসি মেরামত করে), তার কোনও এক জায়গায় আমাকে নিয়ে যা। টাকা আমি তোকে দিবো।’ তখন বাপ্পী মামলার বাদী ময়নুল ইসলামের বাসার কথা বলে।

পরের দিন গত ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পর বাপ্পী, রুবেল ও হৃদয় ওই বাসার খোঁজখবর নিয়ে আসে। পরদিন ২৬ মার্চ বিকালে তারা আবার সেই বাসায় যায়। বাপ্পী ও হৃদয় প্রথমে গিয়ে নক করে। তানিয়া আফরোজ গেট খুলে দেন। বাপ্পী ভিকটিম তানিয়াকে বলে, ‘আমি আপনাদের এসি ঠিক করে দিয়েছিলাম। বাসার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আপনাদের এসি সার্ভিসিং করাবেন কিনা।’

তানিয়া বলেন, ‘তোমার স্যার বাসায় নাই।’ তখন বাপ্পী বলে, ‘স্যারকে ফোন দেন।’ তানিয়া ময়নুলকে ফোন দিলে বাপ্পী তার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে। পরে তাদের কথা অনুযায়ী তানিয়া নিচে নেমে গেটের তালা খুলে দেন। বাপ্পী ও হৃদয় ওপরে উঠে বাসার ভেতরে যায়। বাপ্পী এসির কভার খুলে হৃদয়কে পরিষ্কার করতে বলে। হৃদয় পরিষ্কার করতে থাকলে বাপ্পী কিছু সময় পর জিআই তার আনার জন্য নিচে যায়। বাপ্পী নিচে গিয়ে রুবেলকেও আসতে বলে।

বাপ্পী ওপরে উঠলে কিছু সময় পরে রুবেলও আসে। রুবেল এসেই ভিকটিমের মোবাইল পকেটে ঢোকান। বাপ্পী আর রুবেল আলমারি খুলে জিনিসপত্র নিতে থাকে। সেই মুহূর্তে ভিকটিম ঘরে এসে চিৎকার দেন। তখন রুবেল ভিকটিমকে কাঁথা দিয়ে মুখ চেপে ধরেন। চিৎকার করতে থাকলে বাপ্পী তার ব্যাগ থেকে চাপাতি বের করে প্রথমে ভিকটিমের ঘাড়ে, তারপর পিঠে ও মাথায় কোপ মারে।

এ সময় হৃদয় তানিয়ার বড় সন্তানের মুখে স্কচটেপ লাগায়। আর বাপ্পী চাপাতি ফেলে ছোট বাচ্চার মুখে স্কচটেপ লাগায়। বাপ্পী ভিকটিমের মৃতদেহ থেকে কানের দুল খুলে রুবেলকে দেয়। রুবেল বাচ্চাদের গলা থেকে চেইন খুলে নেয়। সবার আগে হৃদয় আর রুবেল এবং শেষে বাপ্পী দৌড়ে পালিয়ে যায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রাজধানীর সবুজবাগ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকর জালাল উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘তদন্ত করে যা পেয়েছি, তা চার্জশিটে দেওয়া হয়েছে।’

আদালতের সবুজবাগ থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা উপপরিদর্শক সেলিম বলেন, ‘তিন জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীর মা নারাজির আবেদন করেছেন।‘

এ বিষয়ে জানতে তানিয়া আফরোজের মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

/ইউএস/এনএআর/
সম্পর্কিত
শিশু রামিসা হত্যা মামলাআসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
রামিসা হত্যা: সর্বোচ্চ সাজা চায় রাষ্ট্রপক্ষ, লঘুদণ্ডের দাবি আসামিপক্ষের
সর্বশেষ খবর
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি