রাজধানীতে নেই পর্যাপ্ত বিনোদন পার্ক ও শরীরচর্চা কেন্দ্র। খোলা ও পরিবেশসম্মত স্থানের অভাবে মানুষ বিনোদনের খোরাক মেটাতে পারছে না। তাই সন্ধ্যা নামলেই বিভিন্ন অলিগলিতে চায়ের দোকানে চলে মানুষের আড্ডা। আর এই শহরে যে কয়টি উদ্যান আছে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে সেগুলোও রয়েছে অপরাধীদের দখলে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা থানা ও শাহবাগ থানার অধীনে রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও পান্থকুঞ্জের মতো ঐতিহাসিক তিনটি স্থান। এগুলোর একেবারে কাছে কলাবাগান ও শেরেবাংলা নগর থানা। পার্কগুলো ঘিরে ২৪ ঘণ্টা থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল। দিনের বেলায় ভালো পরিবেশ থাকলেও রাতে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে পার্কগুলো।
এসব পার্কে সন্ধ্যা নামলেই বসে মাদকসেবীদের আড্ডা, ভাসমান যৌনকর্মীদের প্রকাশ্যেই চলে দেহ ব্যবসা। বেড়ে যায় হিজড়াদের চলাচল। রয়েছে চুরি-ছিনতাইকারীদের উৎপাত। ফলে এসব স্থান দিয়ে রাতে পথচারীদের ভয়ে চলাচল করতে হয়।
গত ৩০ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। চারদিকে ঝুম বৃষ্টি। শাহবাগ মোড় হয়ে টিএসসি পর্যন্ত পুরো পথ অন্ধকার। বৃষ্টির মধ্যেই শাহবাগ থানা অতিক্রম করে যাওয়া হয় উদ্যানের প্রথম গেটে। গেটের ভেতরে প্রবেশ করলেই ছবির হাট। সেখানে পাঁচ ছয়টি ভ্রাম্যমাণ দোকান রয়েছে। কাকভেজা হয়ে দোকানের ছাউনিতে বসে অনেকেই গল্প করছেন, সিগারেট টানছেন। সেখানেই এককোণে দাঁড়িয়ে গল্প করছেন তিন পুলিশ সদস্যও। মাঝখান দিয়ে মানুষের চলাচল। এ পথে দাঁড়িয়েই এক তরুণী খদ্দেরের খোঁজে পথচারীদের আপত্তিকর প্রস্তাব ও ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন।
এর কয়েক মিনিট পর ছবির হাট পার হয়েই দেখা মেলে দেয়ালঘেরা একটি মঞ্চ। কাছে গেলেই দেখা যায় শতেক মানুষের ভিড়। সেখানে অনেকে বৃষ্টিতে আটকে পড়েছে। তাদের বেশিরভাগই তরুণ। ওই মঞ্চ থেকে গাঁজার গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। কাছে গিয়ে দেখা যায়, তাদের কেউ কেউ মাদক তৈরি করছে, অনেকে তৈরি করা মাদক দলবেঁধে পার্কের অন্য স্থানে গিয়ে সেবন করছে। আবার কেউ কেউ শব্দ করে বলছে, ‘আজকে তামাকটা ভালো পড়েছে।’
১ এপ্রিল রাত ৯টায় সেখানে দেখা গেছে একই চিত্র। তবে এবার স্থান বদলে করেছে। তাদের দেখা যায়নি দেয়ালঘেরা ওই মঞ্চে। গেটের পাশেই শাহবাগ থানার জব্দ করা গাড়ি রাখার স্থান। ঠিক সেখানে অন্ধকার থেকে একটু পর পর কয়েকজন আসছে-যাচ্ছে। কাছে গেলেই নাকে আসে মাদকের গন্ধ। জব্দ করা ওই গাড়ির ফাঁকা জায়গায় বসে মাদক নিচ্ছে তরুণরা। এভাবে পার্কের বিভিন্ন জায়গায় ওপর-নিচ বসে এভাবে মাদক নিতে দেখা গেছে অনেককে।
এমন দৃশ্য প্রতিদিন সন্ধ্যার পর দেখা যায় রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এসব এলাকায় রাতে প্রায়ই টহলে যান শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফ। তার মতে, এখানে যারা আসেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থী। বাইরে থেকেও অনেক আসেন। উদ্যানের ভেতরে নানা সময় অপরাধমূলক কাজ তার চোখে পড়েছে।
আরিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গভীর রাতেও এখানে মানুষের আড্ডা চলে। যেহেতু পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আমরা ধরে নিই তারা শিক্ষার্থী। উদ্যানে যারা মাদক সেবন করে কিংবা অপরাধে জড়ায়, আমরা এলে টের পেয় তারা চলে যায়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিরাপত্তায় নিয়োজিত এক আনসার সদস্য বলেন, আমাদের নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব আছে, সেগুলোই পালন করি। গেটগুলোতে আমরা পাহারা দিই। রাতে গেট খুলতে রাজি না হলে অনেকে দলবেঁধে এসে গেটে লাথি মারে। এ ক্ষেত্রে আমরা অসহায়। আমরা চাইলেও তাদের কিছু বলতে পারি না।
ছবির হাটের পাশে ১৮ বছর ধরে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা করছেন সাব্বির আহম্মেদ। তার মতে, করোনার পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন করে বেড়েছে মাদকসেবীদের আড্ডা, চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা। তার ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে বাইরে থেকে এসেও এসব অপরাধমূলক কাজে জড়াচ্ছে অনেকে।
তিনি বলেন, চোর, ছিনতাইকারী ও প্রতারকরা এই স্থানটিকে নিরাপদ মনে করে। প্রায়ই দেখা যায়, তরুণ যাত্রীরা রিকশা, সিএনজি, অটো এনে চালককে ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকার নোটের কথা বলে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ভাংতি নিয়ে যায়। তারপর সিগারেট কিনে ভাড়া দিচ্ছে বলে উদ্যানের ভেতরে গিয়ে আর ফিরে আসে না। এমন ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। পরে টাকা না নিয়েই দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে চালকরা চলে যায়। সাধারণত রাত ১১টার পর গেট আর খোলা থাকে না। বন্ধ থাকলে অনেকে গেট টপকে উদ্যানে ঢোকেন।
এ প্রসঙ্গে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একটি ঐতিহাসিক স্থান। মানুষ এখানে আসবে, বসবে, ঘুরেফিরে দেখবে, ইতিহাস জানবে। জায়গাটি খোলামেলা থাকার কথা, যেন দূর থেকে একজন আরেকজনকে দেখতে পায়। সাধারণ মানুষ ঢুকবে কীভাবে, উদ্যানজুড়ে বড় বড় গাছ আর অন্ধকার। এ অবস্থায় অনেকে ভয়ে প্রবেশ করবে না। এরপর যদি নানা অপরাধমূলক কাজ সংঘটিত হয়, তাহলে তো আরও সমস্যা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে আগে নাট্যদলগুলো ছোট ছোট নাটক করতো। সেটাও এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিপরীত পাশে রমনা পার্ক। রাত গভীর হলেই পার্কের দেয়ালঘেঁষে জড়ো হয় একদল ভাসমান যৌনকর্মী। ঢাকার কামরাঙ্গীরচর, টঙ্গী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা এখানে আসে। রাত ১১টার পর রাস্তার পাশে কাপড় টানিয়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয় তারা। এসব কর্ম চলে ভোর রাত পর্যন্ত। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে ওভারব্রিজে বসে থাকে অনেক যৌনকর্মী। সেখানেও চলে অপরাধ কর্মকাণ্ড।
আট মাস ধরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন আনসার সদস্য বেলাল হোসেন। প্রায়ই রাতের বেলায় গার্ডের দায়িত্ব পালন করেন উদ্যানের ভিআইপি গেটে। তিনি বলেন, রাত ১১টার পর যৌনকর্মীরা আসতে থাকে এবং ভোর ৫টা পর্যন্ত এখানে থাকে তারা। রিকশা, সিএনজি, অটোচালকরাই মূলত ওদের কাছে আসে। মাঝে মধ্যে ঝামেলা হয়। পুলিশ টহলে এলে যৌনকর্মীদের তেমন কিছু বলে না। তবে যেসব পুরুষ আসে, তাদের ধরতে দেখেছি। কয়েক দিন আগে উদ্যানের ভেতরে একজনের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে গেছিল কয়েকজন।
কারওয়ানবাজার মোড় ও বাংলামটরের মাঝখানে অবস্থিত পান্থকুঞ্জ। পার্কটি পরিত্যক্ত থাকায় মানুষের চলাচল নেই বললেই চলে। এ সুযোগে রাতে সেখানে আড্ডা জমায় যৌনকর্মী, হিজড়া, টোকাই ও মাদকসেবীরা। পুরো পার্কে আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সহজে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
পথচারীদের টার্গেট করেই এই পার্কে বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালায় তারা। তরুণদের ডেকে নিয়ে জোর করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। পার্কের কোনায় বসে মাদকসেবীদের আড্ডা।
গভীর রাত পর্যন্ত এই এলাকায় রিকশা চালান মোশাররফ হোসেন। বলেন, রাত যত গভীর হয়, যৌনকর্মীদের উৎপাত তত বাড়ে। দুদিন আগেও রাত ২টায় রিকশা নিয়ে বাংলামটর থেকে কাওরানবাজারে যাচ্ছিলাম। পান্থকুঞ্জ পার্কটির মাঝ বরাবর এলে দেখতে পাই কয়েকজন মিলে একজনকে টেনেহিঁচড়ে পার্কের ভেতরে নিয়ে যায়। পরে সবকিছু রেখে তাকে ছেড়ে দেয়। অন্ধকারে কে যাবে তাকে উদ্ধার করতে? সুযোগ বুঝে তারা মানুষ ধরে। আর হিজড়ারা পার্কের ভেতরে প্রকাশ্যে ওত পেতে থাকে।
এস আই আরিফ বলেন, অনেক তরুণ এখানে ইচ্ছে করে আসে। আবার হিজড়ারা অনেক পথচারীকে জোর করে ভেতরে নিয়ে যায়। ভেতরে নিয়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। আমরা কিছু বললে হিজড়ারা যা মুখে আসে তা-ই বলে। তবে এমন কিছু দেখলে আমরা তৎক্ষণাৎ আইনি পদক্ষেপ নিই।
১ এপ্রিল রাতে এসব এলাকায় ফোর্স নিয়ে টহল দিয়েছিলেন শাহবাগ থানার এসআই আব্দুল্লাহ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব পাশে যৌনকর্মীদের উৎপাতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাস্তার আইল্যান্ড পর্যন্ত আমাদের এলাকা। রাতে যৌনকর্মীদের মাঝেমধ্যে দেখা যায়। আমাদের চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালাই।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বাংলামটর হয়ে পান্থকুঞ্জ ও রমনা উদ্যান—এসব এলাকার আশপাশে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা পুলিশ টহলে থাকে। তারপরও কেন এসব অপরাধ কমছে না, এমন প্রশ্নের উত্তরে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর মোহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এসব এলাকায় যারা মাদক সেবন করছে, তাদের আমরা গ্রেফতার করছি। অপরাধী তো অপরাধীই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হোক আর যে-ই হোক, অপরাধ করে পার পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।
পান্থকুঞ্জের দিকে শুধু হিজড়া নয়, যৌনকর্মীদেরও চলাচল আছে। আমাদের ফোর্স সবসময়ই থাকে এসব এলাকায়। এসব বিষয়ে আমাদের অভিযান চলছে এবং অব্যাহত থাকবে বলে জানান ওসি নূর মোহাম্মদ।
রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাটের গেটের দিকে যারা বসেন, তাদের বেশিরভাগই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী। সুতরাং ঢালাওভাবে বলা যাচ্ছে না সবাই গাঁজা কিংবা মাদক সেবন করে। ওখানে গিয়ে মাদক সেবন করছে, এমন অভিযোগে আমরা এর আগে অনেককে গ্রেফতার করেছি।
তিনি আরও বলেন, কোনও অপরাধমূলক কাজের খবর পেলে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসছি আমরা। তবে এসব অপরাধমূলক কাজ আগের চেয়ে অনেক কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।









