রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার কোনাপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মো. মনির সরদার (৪৫) নামে এক পথচারী নিহত হন গত ফেব্রুয়ারি মাসে। মনির সরদার ডেমরা সিটি মিলের শ্রমিক ছিলেন। পুলিশ জানায়, তিনি কাজে যাওয়া উদ্দেশ্যে কোনাপাড়া বাসস্ট্যান্ডের সামনে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। এ সময় পেছন থেকে দ্রুতগতিতে আসা একটি গাড়ি তাকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
মনির সরদারের মতো প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীতে কেউ না কেউ নিহত বা আহত হচ্ছেন রাস্তা পার হতে গিয়ে। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মিরপুর-১০, কাওরান বাজার, ফার্মগেট, নিউমার্কেট এলাকা সরেজমিন দেখা যায়, মানুষজন রাস্তাজুড়েই পারাপার হচ্ছে। সিগন্যাল দেখে বা রাস্তায় গাড়ির আনাগোনা দেখে চলাচলের কোনও বালাই নেই। যেখানে-সেখানে রাস্তা পার হতে গিয়ে জাস্ট হাত দেখিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিলেই হলো!
এসব ঘটনায় মানুষজনের অসতর্কতা ও ধৈর্য না থাকা নিয়ে আলাপ ওঠে। বারবারই প্রশ্ন করা হয়—চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে, মাঝ রাস্তা দিয়ে পার হতে হবে কেন, কীসের এত তাড়া? নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এই প্রশ্ন খুবই যৌক্তিক। কিন্তু পাশাপাশি প্রধান প্রশ্ন হলো— ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেন যারা, তারা কেন লোকজনের এভাবে রাস্তা পার হওয়া বন্ধ করতে পারবেন না? তারা চাইলে এই পারাপার বন্ধ করা সম্ভব কিনা?
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীতে ২০২২ সালে তার আগের বছরের (২০২১) চেয়ে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ৯৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়েছে। যানবাহনের ধাক্কায় বা চাপায় পথচারীরা বেশি হতাহত হয়েছেন। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে রাতে ও ভোরে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীতে গত এক বছরে সড়কে ২২৭ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে পথচারীর সংখ্যা ৬০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। কারণ হিসেবে বলা হয়, বাইপাস সড়ক না থাকায় রাতে মালবাহী ভারী যান রাজধানীতে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ফলে পথচারীরা বেশি নিহত হচ্ছেন।
এ সংক্রান্ত আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মোটরযান-চালক, পথচারীর বা সড়ক ব্যবহারকারীর ট্রাফিক সাইন, সংকেত মেনে চলতে হবে। সড়ক ব্যবহারকারীকে সড়ক বা মহাসড়ক পারাপারের সময় ফুটওভারব্রিজ, জেব্রা ক্রসিং, আন্ডারপাস ব্যবহার করতে হবে। যদি কেউ এই ধারার বিধান লঙ্ঘন করে— তা শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচিত হবে এবং তাকে অনধিক এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থ দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে।
ট্রাফিক পুলিশ চাইলেই এই পারাপার থামাতে পারেন উল্লেখ করে মিরপুর-মতিঝিল রুটের বাসচালক সাদেকুল বলেন, ‘কোনও ড্রাইভার ইচ্ছে করে কাউকে চাপা দেয় না। গাড়িচালকের সিটে বসলে বুঝতে পারবেন—চলন্ত গাড়ির সামনে ডিভাইডার থেকে ঝুপঝাপ মানুষ এসে পড়ে রাস্তা পার হওয়ার জন্য, গাড়ি রানিংয়ে আছে, হুট করে চোখের সামনে দেখবেন—কেউ হাত উঁচু করে দৌড় দিয়েছে রাস্তা পার হওয়ার জন্য। তখন করণীয় থাকে না। অথচ একটা কিছু ঘটলে সেই দোষ চালকের? এটা কীভাবে হয়? ওখানে তো কোনও মানুষই থাকার কথা না।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ গুলশান ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার হাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জনগণকে ট্রাফিক আইন মানাতে ট্রাফিক সার্জেন্টসহ সবাই আমরা মাঠে রয়েছি। জনগণকে সচেতন করতে বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি। অনেক সময় দেখা যায়, ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি যাতায়াতের সময় অনেকেই রাস্তা পারাপার করে থাকেন, যা একেবারেই কাম্য নয়। যারা এ ধরনের কাজ করছে, তাদের আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি, সচেতন করার চেষ্টা করছি।’
শুধু জনগণকে সচেতন করলে হবে, নাকি ট্রাফিক পুলিশকে কঠোর ও দায়িত্বশীল হতে হবে—এমন প্রশ্নে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে লোকটা সাধারণ সড়কে আইন মানে না, যত্রতত্র দিয়ে পারাপার করছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, সেই একই লোক রাজধানীর সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে চলাচলের সময় সব নিয়ম মেনে চলে। কিংবা, যে মানুষটি চোখের সামনে ওভারব্রিজ দেখেও মধ্য রাস্তা দিয়ে পারাপার হয়, কিন্তু কোনও আইন-কানুন না জেনে বিদেশে গেলেও ঠিকঠাক নিয়ম মেনে রাস্তায় চলাচল করে, তার বেলা আপনি কী বলবেন? তার মানে আমাদের সড়কের ব্যবস্থাপনায় গলদ আছে। বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রেখে সাধারণ নাগরিককে সচেতন হতে বললে হবে না। গলদ আসলে কোথায় সেটা খুঁজে বের করা দরকার। কেন একই ব্যক্তি সাধারণ সড়কে নিয়ম মানছে না। কিন্তু সেনানিবাসের রাস্তায় মানছে, সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। ট্রাফিক পুলিশ যেকোনও পথচারীর ঝুঁকি নিয়ে পার হওয়া প্রতিরোধ করতে পারেন, কিংবা পথচারী যেন নিজে থেকে সিগন্যালের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থেকে নিরাপদে রাস্তা পার হন—এই বিষয়গুলো নিয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির কোনও কর্মসূচি আছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন কোনও উদ্যোগ নেই। সামনে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।’
ছবি: উদিসা ইসলাম ও সাজ্জাদ হোসেন









