অপহরণের পাঁচ মাস পর এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গাজীপুরে লাশ পাওয়া গেলেও তার বাড়ি নোয়াখালী। পুলিশ বলছে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে এমন একটি চক্র যারা সমতামিতার কথা বলে ফাঁদ পাতে। ফাঁদে পা দেওয়া ব্যক্তিদের নানা রকম হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করে। দাবি পূরণ না করলে অপহরণ ও হত্যার মতো কাজও করে।
বৃহস্পতিবার (১৮ মে) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম। তিনি জানান, ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে বিভিন্ন ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে সমকামি তরুণদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে একটি চক্র। এরপর আগ্রহী তরুণদের গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় ডেকে এনে জিম্মি করে টাকাপয়সা আদায় করে ছেড়ে দেয়। ২০২২ সালের ১৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী থেকে এই চক্রের ডাকে ঢাকায় আসেন আমির হোসেন। এরপর চক্রের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অপহৃত হন। পরবর্তীতে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করলেও টাকা না পেয়ে আমিরকে হত্যা করে লাশ গুম করে চক্রটি। বুধবার (১৭ মে) বিকালে শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পশ্চিমখণ্ড (দারোগাচালা) এলাকার রহিম মোল্লার বাড়ির পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংক থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) দক্ষিণখান থানা পুলিশ।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত বুধবার (১৭) নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ থেকে চক্রের মূলহোতাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ডিএমপির দক্ষিণখান থানা পুলিশ। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো– চক্রের মূলহোতা মো. তারেক ওরফে তারেক আহাম্মেদ (৩১), মোহাম্মদ হৃদয় আলী (২৯), আশরাফুল ইসলাম (২৩), রাসেল সরদার (২৫), তৌহিদুল ইসলাম বাবু (৩০)। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ীই আমিরের লাশ উদ্ধার করা হয়।
ডিসি মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম জানান, ২০২২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে বাড়ি থেকে ঢাকা আসেন আমির। এরপর ২২ ডিসেম্বর দক্ষিণখানে বড়বোনের বাসায় ওঠেন। এরপর তিনি নিখোঁজ হন। ২৮ ডিসেম্বর আমিরের ছোট বোনকে অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা ফোন করে ১০ লাখ টাকা দাবি করে। এই ঘটনায় আমিরের বড় ভাই দক্ষিণখান থানায় ওই দিনই সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। গত ১৩ এপ্রিল একই থানায় অপহরণ মামলার দায়ের করেন তিনি (আমিরের বড় ভাই)।
মোর্শেদ আলম আরও বলেন, অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ও চতুর। তাদের শনাক্ত করতে বেশ কয়েকবার কৌশল পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় চক্রের সদস্য আশরাফুল ইসলামকে সাভারের জিরাবো এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যে রাসেল সরদার ও তৌহিদুল ইসলাম বাবুকে গ্রেফতার করা হয়। তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে চক্রের মূলহোতা তারেক আহাম্মেদ ও তার সহযোগী মোহাম্মদ হৃদয় আলীর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর বুধবার দক্ষিণখান থানার বিশেষ একটি দল নোয়াখালীর দুর্গম হাতিয়া দ্বীপে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, গ্রেফতার তারেকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকার একটি বাড়ির পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে অপহৃত আমিরের হাত-পা বাঁধা ও পলিথিনে মোড়ানো বস্তাবন্দি গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিসি মোর্শেদ আলম জানান, চক্রের মূল হোতা তারেকের ‘কষ্টের জীবন’ নামের একটি ফেইক ফেসবুক আইডি ছিল। এই আইডি দিয়ে বিভিন্ন সময় ফেসবুক মেসেঞ্জারে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সমকামিতার প্রস্তাব দিতো। যারা তার প্রস্তাবে রাজি হত তাদের গাজীপুরের চৌরাস্তা, শ্রীপুর, মাওনাসহ বিভিন্ন এলাকায় ডেকে আনত। এরপর মোবাইল টাকা পয়সা কেড়ে নিয়ে হত্যার ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দিতে। ঠিক এভাবেই আমিরকে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে গাজীপুর চৌরাস্তায় ডেকে নেয়। আমির তার বোনের বাসা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তায় গেলে তারা তাকে জিম্মি করে ফেলে। এরপর বোনের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। প্রতাশিত মুক্তিপণ না পাওয়া ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর আমিরকে হত্যা করে। এরপর বস্তায় লাশ ভরে বাসার পেছনে পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংকে লুকিয়ে রেখে আত্মগোপন করে।









