জীবনের অনেকটা সময়ই বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জে কাটিয়েছিলেন পূরবী ঘোষ (৬০)। কাজের সূত্রে ঢাকায় থাকেন তার বড় ছেলে নির্মাতা সৌমিত্র ঘোষ ইমন। জীবন সায়াহ্নে এসে সন্তান-সন্ততিদের টানে দুই-এক মাস পরপরই চলে আসতেন ঢাকায়। চলতি মাসেও রাজধানীর রামপুরায় ছেলের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। সুযোগ পেলে ছেলের সঙ্গে নিয়মিত চেকআপ করাতে ডাক্তারের কাছেও যাওয়ার কথা ছিল তার। গিয়েছেন বটে, তবে ফিরেছেন সুস্থ হয়ে নয়; লাশ হয়ে।
বুধবার (২১ জুন) রাজধানীর কল্যাণপুরে ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে অপারেশন করাতে এসে ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে।
স্বজনরা জানান, গত ১০ জুন ছেলের বাসার বাথরুমে পড়ে গিয়ে তার মায়ের পায়ে একাধিক ফাটল দেখা দেয়। ফলে অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে। চিকিৎসার জন্য পূরবী ঘোষকে ভর্তি করানো হয় রাজধানীর কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ভারতে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন এই বৃদ্ধার স্বামী শ্যামল কুমার ঘোষও। স্ত্রীর অসুস্থতার খবর শুনে ফিরে আসেন চিকিৎসা শেষ না করেই। তবে ঢাকায় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান পূরবী ঘোষ। স্ত্রীর সঙ্গে শেষ দেখাটাও হয়নি শ্যামল কুমারের।
পরিবারের অভিযোগ, ইবনে সিনা হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হয় পূরবী ঘোষের।
শুক্রবার (২৩ জুন) দুপুরে পূরবী ঘোষের স্বামী শ্যামল কুমার ঘোষ ও তার বড় ছেলে নির্মাতা সৌমিত্র ঘোষ ইমনের সঙ্গে কথা হয়। জীবনসঙ্গীকে এভাবে হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন ষাটোর্ধ্ব শ্যামল। আর মাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের ছোট সন্তান সৌরভ ঘোষও। দাদিকে হারিয়ে উদাস নাতি সৃজন ঘোষ ও ছোট্ট নাতনি সৃজিতা ঘোষও।
সৌমিত্র ঘোষ ইমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত ১৩ জুন কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে আমার মাকে ভর্তি করিয়ে পায়ের অপারেশন করানো হয়। অপারেশনের একদিন পরে থেকে মা কেমন যেন করছিল, কিছুই খাচ্ছিল না। যত সময় যাচ্ছে খারাপের দিকে যাচ্ছিল মা। তখন আমি ডাক্তারকে বলি মা কিছুই খাচ্ছেন না। মুখে একটি পাইপ লাগিয়ে কিছু খাওয়ানো যায় কিনা। এসবের মধ্যে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানালেন মাকে নিয়ে বাসায় চলে যেতে। তখন আমি বললাম, এমন সিরিয়াস রোগীকে কীভাবে বাসায় নিয়ে যাবো? আমার এই কথা শুনে ডা. শাহিদুর রহমান জানালেন, আমার কাজ শেষ। আমি রেফার করে দিচ্ছি মেডিসিন ডাক্তারের কাছে। তখন মায়ের শরীরের অবস্থা নিয়ে উনি কিছু বলেননি। আমিও জানতে পারিনি মায়ের প্রকৃত অবস্থা। আমি ওনাকে বারবার বলছিলাম মায়ের কোনও লাইফ ঝুঁকি রয়েছে কিনা। তখনও তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন, এগুলো ব্যাপার না। ঠিক হয়ে যাবে।
পরবর্তী সময়ে ওই হাসপাতালে রেফার করা মেডিসিন বিভাগে অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সৌমিত্র ঘোষ বলেন, ‘সব কাগজপত্র এবং মাকে দেখার পর উনিও জানালেন, অপারেশনে কোনও সমস্যা হতে পারে; যার কারণে এমনটা হচ্ছে। কারণ, অপারেশনের দুদিন আগে হাসপাতালে আমার মায়ের খাওয়া-কথাবার্তা সবই ঠিকঠাক চলছিল। তিনি পরে নিউরোলজির একজন নারী চিকিৎসকের কাছে পাঠান। সেখানে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, মায়ের অন্য কোনও সমস্যা আছে কিনা। তখন উত্তরে বলেছিলাম, চার বছর আগে মা ব্রেনস্ট্রোক করেছিলেন। এ কথা শুনে ডাক্তার মাকে সিটিস্ক্যান করাতে বলেন। পরে বুধবার সকালে আমার মা মারা যান।’
তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘আমার মা ওই হাসপাতালে ভর্তি অথচ স্ক্যানের রিপোর্ট দুই দিন পরে দিয়েছে। সেখানেও দেরি করেছে। মায়ের অপারেশন করার পর ওটিতে ডা. শাহিদুর রহমান আমার কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা নিয়েছেন, কোনও মানিরিসিট ছাড়াই। তখন তিনি আমাকে নানাভাবে আশ্বস্ত করলেন মা ঠিক হয়ে যাবে। অথচ তারা এখনও বুঝতে পারছেন না, আমার মা আসলে কী কারণে মারা গেলেন। আমার মা একেবারে সুস্থ ছিলেন। সম্প্রতি স্কয়ার হাসপাতালে করানো কিছু পরীক্ষার রিপোর্টেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। মায়ের পটাশিয়ামটা বাড়তি ছিল, এটি কমিয়ে দুদিন পর অপারেশন করানো হয়। এছাড়া অপারেশনের আগে তিনি স্বাভাবিক ছিলেন।
এদিকে, রোগী মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ইমন বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে জানিয়েছে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এ বিষয়ে তদন্ত করে মৃত্যুর কারণ আমাকে জানাবে। ৭২ ঘণ্টা এখনও শেষ হয়নি। ৭২ ঘণ্টার পর আমার অবস্থান আমি পরিষ্কার করবো। আমি কী পদক্ষেপ নিবো, আইনের আশ্রয় নিবো কিনা।’
এদিকে এ ঘটনাটির তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গঠিত তদন্ত কমিটি আগামী দুই কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত করে কারও অবহেলার বিষয় থাকলে সেটি খতিয়ে দেখবে।
এ প্রসঙ্গে ইবনে সিনা হাসপাতালের পরিচালক (মেডিক্যাল সার্ভিসেস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) মো. পারভেজ কবির বলেন, ‘ইবনে সিনা হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. শাহিদুর রহমান খানের অধীনে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীর মৃত্যুর কারণ জানতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই ঘটনায় আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। এখনই মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাচ্ছে না। তবে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। এই রোগীর সংশ্লিষ্ট সব ডাক্তার ও নার্সদের তদন্তের মুখোমুখি করা হবে। কারও দায় পেলে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’









