রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় কি ‘সামাজিক সুরক্ষা’ বিঘ্নিত হচ্ছে?

উদিসা ইসলাম
১৮ নভেম্বর ২০২৩, ০০:০১আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৩, ২১:৪৩

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর টানা কর্মসূচিতে সাধারণ জনগণের মধ্যে ‘নিরাপত্তাহীনতা’ বেড়েছে বলে মনে করছেন অপরাধবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, যখন সাধারণ কাজের বাইরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেশি মনোযোগ দিতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সমাজের নানা অপরাধ বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ছিনতাই, বাসাবাড়িতে চুরি, সড়কে চাঁদাবাজির মতো ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতটা বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, অভিযোগের পরিমাণ তার তুলনায় অনেকটাই কম। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, রাজনৈতিক ইস্যুতে পুলিশ ব্যস্ত থাকায় সামাজিক সুরক্ষার ইস্যুগুলোতে জোরেশোরে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। যদিও বিষয়টি স্বীকার করছে না পুলিশ। বাহিনীটির কর্মকর্তারা বলছেন, এসব মোকাবিলা করতে পুলিশ অভ্যস্ত।

দেশে অক্টোবরের শুরু থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতসহ সমমনা দলগুলোর লাগাতার কর্মসূচি সামাল দিতে ব্যাপক সময় যাচ্ছে পুলিশের। এরইমধ্যে অক্টোবরের ১ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে বসিলা থেকে মোহাম্মদপুর হয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানে হয়ে উঠেছিল ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য। ভরসন্ধ্যাতেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষকে পড়তে হয়েছে ছিনতাইয়ের কবলে। কেবল এক সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন পাঁচটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে; যাদের বিবরণীতে ভয়াবহতা উঠে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে কেবল অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাই ছিল না; কুপিয়ে আহত করার বিষয়ও ছিল। অথচ এর বেশিরভাগেরই থানায় কোনও অভিযোগ নেই।

গত এক সপ্তাহে রাজধানীর শেওড়াপাড়া, পাইকপাড়া ও কাফরুল এলাকার বেশ কয়েকটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে জানালা দিয়ে মোবাইল চুরি থেকে শুরু করে রাতের বেলা দোকানের মালামাল চুরির বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হয়নি। তবে এলাকাবাসী বলছেন, এসব এলাকায় আগে পুলিশের টহল থাকলেও এখন সেটা নিয়মিত দেখা যায় না। 

১৮ অক্টোবর নয়াপল্টন এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পুলিশ সদস্যরা (ফাইল ছবি)

এদিকে ঢাকা মহানগরীকে ছিনতাইমুক্ত করে নগরবাসীর নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিতকরণ এবং অপরাধভীতি দূর করতে ৭ অক্টোবর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ডিএমপি সদর দফতরের উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম বিভাগ) শচীন চাকমাকে সভাপতি করে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

এদিকে বাসের জানালা দিয়ে যাত্রীর মোবাইল টান দেওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শারীরিক আঘাতও। মোবাইল টান দেওয়ার পাশাপাশি চোখে মরিচ জাতীয় কিছু দিয়ে দেওয়া কিংবা জানালা দিয়েই ঘুসি দেওয়ার কয়েকটি ঘটনাও পাওয়া গেছে। তাদের কেউই শেষ পর্যন্ত পুলিশের দ্বারস্থ হতে চান না। যদিও সম্প্রতি এক ব্যক্তি ফেসবুকে শেয়ার করেন যে তিনি ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় গিয়েও ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। কর্তব্যরত পুলিশ তাকে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা এতটাই ব্যস্ত যে এখন অনেক সুরক্ষা সেবার দিকেও মনোযোগ দিতে পারছেন না।

ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে গত শনিবার (৭ অক্টোবর) ১৯ সদস্যবিশিষ্ট এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্সের অন্য সদস্যরা হলেন– ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম-১) একজন, ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের আট জন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, গোয়েন্দা পুলিশের আট জন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এবং অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বা সহকারী পুলিশ কমিশনার (প্রসিকিউশন) একজন।

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে পুলিশকে

এ ধরনের পরিস্থিতিতে অপরাধ কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘থিওরি অব রুটিন অ্যাক্টিভিটিতে বলা হয়, কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে গার্ডিয়ানের অনুপস্থিতি থাকলে, ভিকটিম যদি উপস্থিত থাকে তাহলে অপরাধীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। যেহেতু পুলিশ এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, ফলে অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু খামতি তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। সেই সুযোগ সমাজের এসব অপরাধী নিতে পারে। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সেই কাজটা সুচারুভাবে সামাল দেওয়ার সুযোগ আছে।’

সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না, এমন কোনও কথা সরাসরি স্বীকার করছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, হরতাল কিংবা অবরোধ কেন্দ্র করে পুলিশ সদস্যদের প্রতিনিয়ত মাঠে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে উল্লেখ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপির (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সব বিষয় মাথায় রেখেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে হয়। জনগণের জানমাল নিরাপদ রাখা, চুরি ছিনতাই প্রতিরোধে নজরদারির পাশাপাশি সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনাতেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা।

পুলিশ এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে অভ্যস্ত উল্লেখ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নতুন কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘তেমন কোনও সমস্যা নেই। আমি মানুষের সঙ্গে মিশি, তেমন কোনও অস্থিরতা আমার চোখে পড়ছে না।’

/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
কিশোর গ্যাং ধরে তাবলীগে পাঠাবো: পুলিশ সুপার
সর্বশেষ খবর
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম