মাদক মামলা: আড়ালেই থেকে যাচ্ছে মূলহোতারা

নুরুজ্জামান লাবু
১১ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৩:৫৯আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৩:৫৯

বিভিন্ন অভিযানের মাধ্যমে দেশে প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন মাদক। মামলার বাদী হচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। জব্দ করা হচ্ছে মাদকদ্রব্য। তদন্ত শেষে আদালতে জমা দেওয়া হচ্ছে অভিযোগপত্রও। তারপরও দেখা যাচ্ছে, মাদক মামলার বিচার শেষে সাজার হার কম। মাত্র ৩৭ শতাংশ মামলায় সাজা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্তে অবহেলা, যথাযথ প্রক্রিয়ায় মাদক জব্দ না করা, যথাযথ সাক্ষ্যের অভাব কিংবা সাক্ষ্য দিতে অনীহার কারণে খালাস পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। এছাড়া আইনের ফাঁকফোকর তো আছেই। আর আইনের আওতায় আনা বা সাজা যাদের হচ্ছে, তারা মূলত মাদক বহনকারী। এসব কারণে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে মূলহোতারা।

সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতরের ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় মাদক মামলায় সাজার হার কম নিয়ে আলোচনা হয়। ওই আলোচনায় মাদক মামলায় সাজার সংখ্যা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক মামলার বাদী হচ্ছে পুলিশ। সাধারণত মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পর মামলা দায়ের করা হয়। মাদকদ্রব্যসহ কোনও ব্যক্তি গ্রেফতার হলে আদালত থেকে তার খালাস পাওয়ার কথা নয়। কেন এবং কীভাবে মাদক মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার জন্য বিভিন্ন ইউনিট-প্রধানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুলিশের শীর্য পর্যায় থেকে।

পুলিশ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ওই পর্যালোচনা সভায় দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে প্রায় ৩৮ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ মামলা উদ্ধারজনিত। এসব মামলার বেশিরভাগই মাদকদ্রব্য উদ্ধারের।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত যেকোনও পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পরই পুলিশ বা অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু যথাযথ প্রক্রিয়ায় মামলা দায়ের না করা, যথাযথ প্রক্রিয়ায় মাদকদ্রব্য জব্দ না করা এবং তদন্তে গাফিলতির কারণে আসামিরা আদালতে গিয়ে ছাড় পায়। সম্প্রতি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে পুলিশের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে কয়েকটি মামলার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে—মাদক মামলার একাধিক আসামিকে গ্রেফতার করা হলেও তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়নি। মোবাইল ফোন জব্দ না করার কারণে মাদকের উৎস, সরবরাহকারী এবং শেষ পর্যায়ের গ্রাহকের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাদক মামলার আসামিদের মোবাইল ফোন জব্দ হলে নম্বরগুলোর কল রেকর্ড যাচাই-বাছাই করে মাদক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং পালিয়ে যাওয়া বা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের পরিচয় জানা সম্ভব হবে।

মাদক মামলার বিভিন্ন অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শুধু মাদক বহনকারীদেরই অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়। তদন্তে মাদকের উৎস পর্যায়ের ব্যক্তি এবং সরবরাহকারী কার কাছে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে, তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে না। ফলে মাদক ব্যবসার মূলহোতারা সবসময় আড়ালে থেকে যায়। মাদক ব্যবসায়ীরা অর্থের বিনিময়ে সরবরাহকারীদের নিয়োগ করে, যারা বিভিন্ন পরিমাণে মাদকদ্রব্য এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছে দেয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদক বা অস্ত্র যার কাছে থাকবে, তাকেই গ্রেফতার বা তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিতে হয়। রুট পর্যন্ত যাওয়া হয় না, এমন নয়। অনেক সময় রুট লেভেলে গিয়ে মূলহোতাদেরও গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু মাদকের যদি চাহিদা ও জোগান সমান থাকে, তাহলে শুধু এনফোর্সমেন্ট দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করার সম্ভব নয়।’

সাজার হার কম প্রসঙ্গে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আদালতে সব মামলার ক্ষেত্রেই বিয়নন্ড ডাউট বা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু আমাদের এখানকার বিচারিক ব্যবস্থায় সাক্ষীদের হাজির করা অনেক কঠিন। আবার যারা সাক্ষী হন, তারা আদালতে গিয়ে সত্যটা বলতে চান না। আসামিপক্ষ অনেক সময় সাক্ষীদের ম্যানেজ করে ফেলে। এজন্য সাজার হার কম হয়। আমরা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছি।’

বছরখানেক আগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার শফিকুল ইসলাম মাদক মামলার তদন্তে একটি বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশনায় সব মাদক মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে রুট পর্যন্ত অনুসন্ধানপূর্বক মাদকের প্রকৃত মালিক বা মূলহোতাদের খুঁজে বের করে অভিযোগপত্র দিতে বলেছিলেন। কিন্তু মাদক মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা কখনোই রুট পর্যন্ত পৌঁছাতে চান না।

অবশ্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মাদক বা অন্যান্য যেকোনও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় পরিদর্শক বা উপপরিদর্শক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। তাদের হাতে এত বেশি মামলার তদন্তভার ন্যস্ত থাকে যে একটি মামলা নিয়ে দিনের পর দিন পরে থাকার সুযোগ নেই। এ কারণে বাহক হিসেবে যাকে গ্রেফতার করা হয়, তাকেই আসামি করে আদালতে চার্জশিট দিতে হয়।

গোয়েন্দা পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে ইয়াবার ৯০ ভাগ চালান আসে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম এলাকা থেকে। ঢাকায় ইয়াবাসহ একজন বাহককে গ্রেফতারের পর মূলহোতা পর্যন্ত পৌঁছাতে তদন্ত কর্মকর্তাকে দিনের পর দিন চট্টগ্রাম বা কক্সবাজার এলাকায় অবস্থান করতে হবে। হুটহাট অভিযান চালালে সফলতা নাও আসতে পারে। আবার ঢাকা বা ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে যেসব গাঁজার চালান জব্দ করা হয়, এসব চালান আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা কুমিল্লার সীমান্ত এলাকা থেকে। এখন মূলহোতাদের ধরতে হলে কুমিল্লা বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তারা সময় স্বল্পতার কারণে মূলহোতা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না।

পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আদালতে মাদক মামলা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সাক্ষী এবং জব্দকৃত মাদকের প্রমাণাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মামলার এজাহার থেকেই একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তারা আসামিদের সুবিধা দেওয়ার জন্য কৌশল অবলম্বন করেন। এরমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অন্যতম একটি বিষয় হলো—মাদকদ্রব্য জব্দের স্থান। শরীর থেকে উদ্ধার করা বা নিয়ন্ত্রণাধীন জায়গা থেকে উদ্ধার এবং পার্শ্ববর্তী স্থান থেকে উদ্ধার মামলা প্রমাণে পার্থক্য তৈরি করে। কারণ, শরীর থেকে উদ্ধার না হলে আসামিরা আদালতে উদ্ধারকৃত মাদক তার নয় বলে প্রমাণের চেষ্টা করে। এছাড়া আদালতে প্রমাণের ক্ষেত্রে সাক্ষীদেরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

সম্প্রতি ফরিদপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পঞ্চম আদালত থেকে পুলিশ সদর দফতরে মাদক মামলার আলামত জব্দ যথাযথ প্রক্রিয়ায় না করা নিয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে একাধিক মামলার উদাহরণ দিয়ে ঘটনাস্থলে আলামত জব্দ ও সিলগালা না করার নমুনা তুলে ধরা হয়েছে। এবং আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় অভিযানকারী পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে মাদক জব্দের পর সিলগালা না করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এছাড়া কোনও কোনও সাক্ষী ভিন্ন ভিন্ন সাক্ষ্য দিয়েছেন। ফলে মামলা প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয় জানিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আলামত জব্দ করার নির্দেশনা ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা, ছয় জন গ্রেফতার
মোবাইলের আসক্তি নেশাজাতীয় দ্রব্যের মতোই ক্ষতিকর: আইজিপি
মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের আটকে রাখতে না পারার কারণ জানালেন আইজিপি
সর্বশেষ খবর
হাত মেলানোর রীতি থেকে দূরে থাকলো ভারত-পাকিস্তান, দুবাইয়ে ফের একই দৃশ্য
হাত মেলানোর রীতি থেকে দূরে থাকলো ভারত-পাকিস্তান, দুবাইয়ে ফের একই দৃশ্য
থাইল্যান্ডে মিললো রহস্যময় ‘শয়তান ফুল’
থাইল্যান্ডে মিললো রহস্যময় ‘শয়তান ফুল’
অ্যাম্বুলেন্সে কী করা যাবে, কী করা যাবে না
অ্যাম্বুলেন্সে কী করা যাবে, কী করা যাবে না
ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকার মৃত্যু: কারাগারে তিন আসামি
ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকার মৃত্যু: কারাগারে তিন আসামি
সর্বাধিক পঠিত
বন্ধ হয়ে গেলো ১৮ বছর ধরে চলা দূরপাল্লার বাস সার্ভিস
বন্ধ হয়ে গেলো ১৮ বছর ধরে চলা দূরপাল্লার বাস সার্ভিস
পরীমণির প্রথম সিনেমায় পারিশ্রমিক কত ছিল
পরীমণির প্রথম সিনেমায় পারিশ্রমিক কত ছিল
বৃন্দাবনের যে অংশে সন্ধ্যার পর প্রবেশ নিষেধ
বৃন্দাবনের যে অংশে সন্ধ্যার পর প্রবেশ নিষেধ
বিশ্বের নতুন মানচিত্র অনুমোদন দিলো জাতিসংঘ
বিশ্বের নতুন মানচিত্র অনুমোদন দিলো জাতিসংঘ
সরকার যাত্রা শুরুর ছয় মিনিটের আগেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে: মামুনুল হক
সরকার যাত্রা শুরুর ছয় মিনিটের আগেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে: মামুনুল হক