কোকেন পাচার (চলমান) ও মানবপাচার মামলায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অভিযোগ-দুর্নীতির বিষয়গুলো ধামাচাপা দিতেই তৎপর রয়েছে বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাদের জড়িত থাকার বিষয় উঠে এলেও, অভিযোগের সত্যতা বা ঘটনা তদন্ত চাপা পড়ে আছে। অভিযুক্তরা একদিকে কোকেন পাচার মামলার আসামি হয়ে হাজিরা দিচ্ছেন আদালতে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রফতানি কার্গো সেকশন হওয়ায় যেকোনও পণ্য পাঠাতে নানা প্রতিষ্ঠানকে দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ঘুষ। চাহিদা অনুযায়ী টাকা না পেলে মালামাল পাঠাতেও সৃষ্টি হচ্ছে ধীরগতি।
রফতানি কার্গো সেকশনের নানা অভিযোগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা ট্রিবিউনে ‘বহাল তবিয়তে সিভিল এভিয়েশনের অসাধু কর্মকর্তারা’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়।
গোয়েন্দা তালিকায় সিভিল এভিয়েশনে কর্মরত মানবপাচারের অভিযোগে অভিযুক্তদের যাদের নাম রয়েছে, তারা হলেন মো. হাসান পারভেজ, মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, মো. কবির হোসেন, মোহাম্মদ কবির হোসেন, মোহাম্মদ আমির হোসেন, মো. মনিরুজ্জামান খান, মো. শাহজালাল সরকার, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মো. ফজলুল হক, মো. শাহজাহান, মো. মিজান, মিজানুর রহমান খান, জিল্লুর, শাহাদাত, বাবুল চন্দ্র দাস, কাজী তোফায়েল, গাজী আজাদ, তানভীর হোসেন মিয়া, সোহেল রানা, কাজী মাসুদ, আব্দুল মতিন, ইদ্রিস মোল্লা, সাখাওয়াত হোসেন, তুহিন, আইনুদ্দিন, রফিক, দীপক ও আসাদুজ্জামান খোকন।
সংবাদ প্রকাশের পরপরই বিষয়টি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর নজরে এলে মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটিকে এসব বিষয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়ে জানানোর জন্য বলা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়ার পরও ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও, তদন্তে কী পাওয়া গেছে বা কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে অভিযুক্তদের বিষয়ে, কোনও কিছুই জানানো হয়নি মন্ত্রণালয়কে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংবাদ প্রকাশের পর এখনও অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তেই রয়েছে। আগের জায়গাতেই তারা নিয়মিত ডিউটি করে যাচ্ছেন। ডিউটির শিডিউল এর কোনও পরিবর্তন হয়নি। সংবাদ প্রকাশের পর শুধু বেবিচকের সহকারী পরিচালক প্রশাসন ইফতেখারুজ্জামান তাদের নামমাত্র ডেকেছিলেন। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত করতে কোনও সিদ্ধান্তও হয়নি। পরে আর কোনও ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি তাদের বিরুদ্ধে। কোনও বিষয়ই তদন্তও করেনি বেবিচক।
এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটির সহকারী পরিচালক (নিরাপত্তা) ইফতেখার জাহান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে ও ওয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।
কোকেন মামলার আসামি হিসেবে এখনও নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন রফতানি কার্গো সেকশনের ডিএসও হিসেবে কর্মরত সিকিউরিটি ইনচার্জ সাইদুল হক ভূঁইয়া। তিনি একদিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে কোকেন মামলার আসামি হিসেবে আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। এ নিয়ে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মুখে কুলুপ এঁটেছে কর্তৃপক্ষ।
কোকেন পাচারের সেই মামলায় সিভিল এভিয়েশনের আরও তিন কর্মকর্তার মধ্যে দুজন এরই মধ্যে অবসরে গিয়েছেন। আর একজন হলেন সালাউদ্দিন, যিনি হিসাব শাখায় কর্মরত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে সিভিল এভিয়েশনের সদস্য (প্রশাসন) মাহবুবুর রহমান তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কার্গো সেকশনের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের বিষয়টি বাংলাদেশ বিমান দেখভাল করে। বিষয়টি তারাই ভালো বলতে পারবে। কার্গো সেকশনের স্ক্রিনিংয়ের দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশনের এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তারা সিভিল এভিয়েশনের। তাদের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে কি না, বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে এড়িয়ে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রফতানি কার্গো সেকশনে ডিউটি সিকিউরিটি অফিসার ডিএসও হিসেবে সাইদুল হক ভূঁইয়া, শিফট ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, নিরাপত্তা অপারেটর (চলতি দায়িত্ব) জহিরুল হক, নিরাপত্তা সুপারভাইজার বদরুল আলম, নিরাপত্তা সুপারভাইজার গোলাম মো. আজাদ, নিরাপত্তা সুপারভাইজার ফখরুদ্দিন ভূঁইয়া, এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (এডিএস) মেশিনের কর্মরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার মাসুদ করিমের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ থাকলেও, তারা দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় কাজ করে যাচ্ছেন। আর তাদের পেছন থেকে মদদ দিচ্ছেন কয়েকজন উচ্চপদস্থ অসাধু কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, এসব অসাধু কর্মকর্তাকে মাসিক ভিত্তিতে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে রাখেন তারা।
রফতানি কার্গো সেকশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিদেশে যেকোনো ধরনের মালামাল পাঠাতে রফতানি কার্গোতে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ না দিলে ঠিক সময়ে মালামাল পাঠানো সম্ভব হয় না। তারা মালামাল ফেলে রাখে। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলেও নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। এই জায়গায় ঘুষ ওপেন সিক্রেট বিষয়।
এরই মধ্যে গত এপ্রিল মাসে রফতানি কার্গো এলাকায় দুটি মূর্তি জব্দ করা হয়। শিফট ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দায়িত্বে থাকার সময় ধরা পড়ে মূর্তি দুটি। পরে এসব মূর্তি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ল্যাব টেস্টে পাঠানো হয়। তবে টেস্টে কী রিপোর্ট এসেছে বা কারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত, এসব বিষয়ে কোনও তথ্য দেননি বেবিচকের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।
বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের নজরে এসেছিল। এর পরপরই বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বিষয়টি সম্পর্কে আমাকে বেবিচক কিছু জানায়নি। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। বিষয়টি আমি খোঁজ নেবো।
প্রকাশিত সংবাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, বিষয়টি জানতে সিভিল এভিয়েশনের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর মোহাম্মদ নাঈমুজ্জামান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে বার্তা ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠিয়েও কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।









