রাজধানীর তেজগাঁওয়ে নেত্রকোনা থেকে আসা ‘মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস’ ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আসামিদের শনাক্তের দাবি করলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের ধারণা, গাজীপুরের ট্রেনের লাইন কাটার সঙ্গে আগুন দেওয়ার যোগসূত্র থাকতে পারে। এ জন্য গাজীপুরের ট্রেনে লাইন কাটার ঘটনায় পলাতক আসামিদের গ্রেফতারেও অভিযান চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ভিডিও ফুটেজ দেখে সন্দেহভাজন আসামিদের মুখচ্ছবি শনাক্ত করলেও তাদের বিস্তারিত পরিচয় জানতে পারেননি। এ জন্য গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাবের পক্ষ থেকে ট্রেনে নাশকতাকারীদের শনাক্তের দাবি করা হয়।
গত ১৯ ডিসেম্বর ভোরে নেত্রকোনা থেকে ঢাকাগামী ট্রেন ‘মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস’-এ আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে ট্রেনটির মাঝখানের তিনটি বগি পুড়ে যায়। আগুনে এক মা ও শিশুসহ চার জন নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, ট্রেনটি রাজধানীর বিমানবন্দর স্টেশন পার হওয়ার পর আগুন দেওয়া হয়। অগ্নিসংযোগের স্থান থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে তেজগাঁও স্টেশনে গিয়ে ট্রেনটি থামার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভান।
এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরের বনখারিয়া এলাকায় রেললাইনের প্রায় ১৮ ফুট অংশ কেটে সরিয়ে রাখে দুর্বৃত্তরা। এতে একই রুটে চলাচলকারী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসেরই আরেকটি ট্রেন দুর্ঘটনায় পতিত হয়। সেসময় একজনের মৃত্যু ও অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হন। ওই ঘটনায় গাজীপুরের বিএনপি নেতা ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজমল ভুঁইয়ার পরিকল্পনায় স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা ঢাকা থেকে দুজন ওয়েলডিং মিস্ত্রিকে ভাড়ায় নিয়ে রেললাইন কাটে বলে জানিয়েছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, তারা ধারণা করছেন গাজীপুর ও তেজগাঁওয়ের ঘটনা দুটো একই সূত্রে গাঁথা। গাজীপুরের ঘটনায় রেললাইন কাটার ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়া স্থানীয় আজিম উদ্দিন কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইবনে সিনা চৌধুরী তোহা ও মহানগর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুম এখনও পলাতক রয়েছে। তারাই রাজধানীতে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে আগুন দিতে পারে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব সূত্র জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে বিমানবন্দর স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন। মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস যখন বিমানবন্দর স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল সেসময় যারা ট্রেনটিতে উঠেছেন ও নেমেছেন তাদের সন্দেহ করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্বৃত্তরা ট্রেনের মাঝামাঝি কামরায় আগুন দেওয়ার পর বিমানবন্দর স্টেশনে নেমে থাকতে পারে। আগুন লাগানোর পর চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নামা সম্ভব নয়। এছাড়া মাঝামাঝি কোনও একটি কামরায় আগুন দেওয়ার পর দুর্বৃত্তরা অন্য কামরায় গিয়ে সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে মিশে তেজগাঁও স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে গেছে। মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনটি আন্তনগর হওয়ায় এক কামরা থেকে আরেক কামরায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দর স্টেশনে মাস্ক ও ক্যাপ পরা এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মুভমেন্টকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। তবে এখনও তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এর বাইরে তেজগাঁও স্টেশনে টুপি পরা দুজন এবং আরও দুই ব্যক্তির গতিবিধিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। তারা ট্রেন থেকে নেমেই দৌড়াচ্ছিলেন। পাঞ্জাবি ও টুপি পরা দুজন কিছু দূর এগিয়ে গেলেও পুলিশকে দেখে তাদের গতিপথ পরিবর্তন করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, তাদের শরীরের ভাষা বলছে, তারা পুলিশকে দেখে ভয় পেয়েছেন। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, নৃশংস এই ঘটনাটির ছায়াতদন্ত করছে ডিবি। ডিবির একাধিক টিম নাশকতায় জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
র্যাব-১ অধিনায়ক লে. কর্নেল মোশতাক আহমেদ জানান, গত বৃহস্পতিবার স্টেশন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানটি মূলত দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ বার্তা। এটি অব্যাহত থাকবে। এর বাইরে তেজগাঁওয়ের নৃশংস ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে র্যাব-১-সহ সংস্থাটির অনেক ব্যাটালিয়ন এবং ইন্টিলিজেন্স ইউনিট কাজ করছে। আমরা বিশ্বাস করি, শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।









