রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে অনুমোদিত কাঁচা বাজার আছে ৬৪টি। এর বাইরে কোথাও কাঁচা বাজার স্থাপনের অনুমতি নেই। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। মহানগরীর মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কাঁচা বাজার। কোথাও সড়কে, কোথাও ফুটপাথ আবার কোথাও সরকারি জায়গা দখল করে চলছে এসব বাজার। এসব ‘অবৈধ বাজার’ নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কোনও পদক্ষেপও দেখা যায় না। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবে তারা।
সরেজমিনে মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, মগবাজার, মহাখালী এবং বনানীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি মোড়েই গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন কাঁচাবাজার। কোথাও ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে করে, আবার কোথাও ফুটপাথে চৌকি বসিয়ে এসব বাজার পরিচালনা করা হচ্ছে। অনেক আবাসিক এলাকার গলিতে গলিতেও গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ বাজার।
খাতা-কলমে বৈধতা না থাকলেও এসব বাজার গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী নানা গোষ্ঠীর হাত। দোকানিরা পথেঘাটে এসব ব্যবসার করার বিনিময়ে দৈনিক বা মাসিক হারে ভাড়া পরিশোধ করলেও কার কাছে ভাড়া দেওয়া হয়— তা কথা বলতে চান না ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা। উল্টোদিকে দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এসব ভ্রাম্যমাণ কাঁচাবাজার উচ্ছেদ করতে এলে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা উপস্থিত হন। ‘মানবিক কারণে দোকান না সরানোর’ অনুরোধ নিয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রমে বাধা দেন তারা।
সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, তাদের মালিকানাধীন এবং অনুমোদিত বাজারগুলো বাদে অবৈধ বাজারগুলোর নির্দিষ্ট কোনও তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে এসব অবৈধ বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হলেও কিছু প্রভাবশালীদের কারণে তা নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বাজার মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি শহিদ উল্লাহ মিনু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিছু ছদ্মবেশী লোক এসব বাজার বসিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও উদ্যোগী হয়ে এসব দোকান উচ্ছেদ করতে দেয় না। তারা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুপারিশ নিয়ে আসেন।’
তবে প্রতিটি ওয়ার্ডে কাঁচাবাজার স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে জানিয়ে শহিদ উল্লাহ মিনু বলেন, ‘মেয়র মহোদয়ের নির্দেশনায় আমরা করপোরেশনের সকল ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে কাঁচাবাজার নির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছি। এটি বাস্তবায়ন হলে অনুমোদনহীন বাজার কমে আসবে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসেন জানান, ‘সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন বাজারগুলো বাদে বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠা বাজারগুলো সম্পর্কে তাদের কাছে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে এসব বাজার উচ্ছেদ করার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অনুমোদনহীন এসব বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈধ বাজারে ব্যবসা করতে যেমন ভাড়া দিতে হয় তারাও তেমন ভাড়া দিয়েই দোকান পরিচালনা করেন। তবে কাদের ভাড়া দেন তা জানতে চাইলে তারা কেউই কথা বলেন না।
রাজধানীর মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে গড়ে ওঠা অস্থায়ী কাঁচাবাজারের সবজি ব্যবসায়ী নেছার উদ্দীন জানান, প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর পর্যন্ত ভ্যানে সবজি বিক্রি করেন তিনি। এজন্য তাকে ভাড়া হিসেবে দৈনিক দুইশ টাকা এবং রাস্তার খরচ হিসেবে ৩০ টাকা দিতে হয়। আরও কয়েকজন দোকানি একই হিসাব দিলেও কার কাছে এই টাকা জমা দেন তা জানতে চাইলে আর কথা বলতে চাননি তারা।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীর দাবি, এলাকাভেদে নিয়ন্ত্রণের ধরনও ভিন্ন। কোথাও ক্ষমতাসীন দলের কেউ প্রভাব বিস্তার করেন। কোনও ক্ষেত্রে ‘আইনশৃঙ্খলাবাহিনী’র কোনও-কোনও কর্মকর্তার আশ্রয়ও মেলে। সব মিলিয়ে নানা পক্ষকে আর্থিক উৎকোচ দিতে হয় ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়টি সরাসরি আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তবে সিটি করপোরেশন যখন অননুমোদিত স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করে আমরা তাদের সহযোগিতা করি। সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ থাকলে আমরা খতিয়ে দেখবো।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের পর অসংখ্য মানুষ পেশা হারিয়েছে, পেশা বদলেছে। এসব প্রভাব এসে পড়েছে বাজারে। কেবল কাঁচা বাজারই নয়, কাপড়ের, চায়ের দোকানের সংখ্যাও বিগত দুই তিন বছরে বেড়েছে অনেক। সেগুলোর কোনও পরিসংখ্যান নেই।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, করোনার অভিঘাতে একটি নির্দিষ্ট আয়সীমার নিচের অনেক মানুষ কর্ম হারিয়েছেন। তাদের একটা অংশ ভ্রাম্যমাণ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে জীবন ধারণ করার চেষ্টা করছে। তবে এর মধ্যেও অনেক ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চাঁদাবাজির মতো ঘটনা ঘটছে। এটা রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতা।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এসব অনুমোদনহীন বাজার নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করছে। একইসঙ্গে এসব বাজার নিয়মের মধ্যে থাকলে সরকার এখান থেকে যে রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাও বঞ্চিত হচ্ছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেখানে ইচ্ছা হচ্ছে সেখানেই বাজার বসানো হচ্ছে, পুরো শহরটাই যেন বাজার। এতে করে স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।’
বাজার গড়ে ওঠার একটা প্রক্রিয়া আছে, সরকার এখান থেকে রাজস্ব পায়। এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে মনে করেন গোলাম রহমান।








