বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে চলছে বাঙালি বইপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় আসর প্রাণের বইমেলা। আর মাসব্যাপী এই মেলায় স্টল-প্যাভিলিয়নে প্রকাশকরা সাজিয়ে বসেছেন হরেক রকম বইয়ের পসরা। অন্যদিকে মেলার বাইরে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোর পাশে বসেছে বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ দোকান। এসব দোকানে মিলছে, ফুচকা, চটপটি, ভেলপুরি, পানিপুরি, আলুর টর্নেডো, ছোলার মাখা চানাচুর, মাশরুমের বড়া, হাওয়াই মিঠাই, তিলের খাজা ও মোমোসহ নানান মুখরোচক খাবার।
অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও একপাশে খাবারের স্টলের ব্যবস্থা রেখেছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। তবে মেলার এই অংশটিতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা ও সময়োপযোগী পরিকল্পনার অভাবের অভিযোগ রয়েছে দর্শনার্থী, বিক্রয়কর্মী ও লেখকদের। বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) মেলার খাবার স্টল অংশ ঘুরে দেখা যায়, মেলা শুরুর এক সপ্তাহ পার হলেও এখনও খাবারের নির্ধারিত মূল্য তালিকা তৈরি করতে পারেনি বাংলা একাডেমি। ইচ্ছেমতো দাম বসিয়ে বেচাবিক্রি করছে দোকানগুলো।
বইমেলার খাবার স্টল অংশের পুরোটা এখনও গুছিয়ে ওঠেনি। অধিকাংশই পিঠা আর ফুচকার দোকান। মাত্র একটি দোকানে পিঠার সঙ্গে রাখা হয়েছে মাংস, লুচি, রুটি। এর বাইরে একটি কফির দোকান, কয়েকটি মোমো আর আইসক্রিমের দোকান। দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যেকোনও রকমের পিঠা প্রতি পিস সর্বনিম্ন ৪০ টাকা, ফুচকার প্লেট ৬০ টাকা, মোমো প্রতি প্লেটে ৫টা ১০০ টাকা, কফি ৩০ টাকা। আর মাংস, লুচি, রুটির প্যাকেজ রাখা হচ্ছে ৩৫০ টাকা।
বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে এসে মোমো খাচ্ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তুবা তাবাসসুম। তিনি বলেন, পিঠার দাম ৪০ টাকা করে। ৫টা মোমো ১০০ টাকা। রাস্তার ধারে একই মানের পিঠা ও মোমো প্রায় অর্ধেক দামে পাওয়া যায়।
মেলার খাবার দোকানের মান নিয়েও আক্ষেপ দর্শনার্থীদের। বিগত সময়েও ভাজাপোড়ার দোকানেই সীমাবদ্ধ ছিল বইমেলার খাবারের দোকানগুলো। দর্শনার্থীরা বলছেন, মেলায় খাবারের দোকানে বৈচিত্র্য রাখা যেতো। ভাজাপোড়া, ফুচকার বাইরেও সবার রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী খাবার রাখা যেতো। একজন পাঠক দীর্ঘ সময় বই মেলায় থাকেন। এসময়ে তার ক্ষুধা লাগতেই পারে। ফলে বাধ্য হয়েই নির্দিষ্ট কিছু খাবারই খেতে হচ্ছে তাদের। আবার কেউ কেউ ভেতরের স্টলে না বসে ভিড় করছেন বাইরের ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতে।
দোকানদাররা জানিয়েছেন, এসব দোকানে বিক্রি-বাট্টা মোটামুটি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসব দোকান বন্ধে প্রায়শই অভিযান চালাচ্ছেন। দোকানগুলো বন্ধ করতে কিছুক্ষণ পরপরই চলছে ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’। তাই তেমন একটা সুবিধা করতে পারছেন না দোকানিরা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আলুর ‘টর্নেডো’ রিং চিপস বিক্রি করছে সজীব ভুঁইয়া। তিনি জানান, মেলা উপলক্ষে খাবারের চাহিদা অনেক। কিন্তু পুলিশ আর প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা মাঝে মাঝে এসে ধাওয়া দেয়, তাতে সুবিধা করতে পারছি না।
ছোলা মাখা চানাচুর বিক্রি করছেন মো. রুবেল মিয়া। তিনি টিএসসি থেকে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের তাড়া খেয়ে বাংলা একাডেমির বাহিরপথে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন ২ হাজার টাকার মতো বিক্রি করি, খরচপাতি বাদ গিয়ে ৮’শ টাকার মতো থাকে। মেলার জন্য বেচাবিক্রি ভালোই হচ্ছে, তবে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে দিচ্ছে না।
টিএসসি সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেলার বাহির পথে দাঁড়িয়ে মোমো খাচ্ছিলেন রাহাদ-মারিয়া দম্পতি। রাহাদ শাহরিয়ার বলেন, ‘মেলায় ঘুরতে এসেছি, বইও কিনবো। তবে মেলায় ঢোকার পথে খাবার দেখে খাওয়ার ইচ্ছে জাগলো, তাই খাচ্ছি। আরও বন্ধু-বান্ধব আসবে, আড্ডা দেবো।’
আলুর ‘টর্নেডো’ খাচ্ছিলেন সাজিয়া জাহান। তিনি বলেন, মেলার ভেতরে তিন বান্ধবীসহ ঘুরলাম। ভেতরে খাবার আছে, তবে দাম বেশি। তাই বের হয়ে এখানে খাচ্ছি। দাম কমের পাশাপাশি খাবারের বৈচিত্র্যও আছে। মেলায় শেষ হওয়া পর্যন্ত ঘুরবো।
নতুন বই
অমর একুশে বইমেলা ২০২৪-এর সপ্তম দিন নতুন বই এসেছে ৬৯টি। গল্প ১০, উপন্যাস ১৫, প্রবন্ধ ৬, কবিতা ১৫, ছড়া ২, শিশুসাহিত্য ৫, জীবনী ৩, রচনাবলি ২, বিজ্ঞান ১, ভ্রমণ ১, ইতিহাস ১, বঙ্গবন্ধু ১, ধর্মীয় ১, সায়েন্স ফিকশন ৩ ও অন্যান্য ৩টি।
মূল মঞ্চের আয়োজন
বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ: গোবিন্দ চন্দ্র দেব শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক প্রদীপ কুমার রায়। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জয়দুল হোসেন এবং সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক।
প্রাবন্ধিক অধ্যাপক প্রদীপ কুমার রায় বলেন, ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব নানা অভিধায় অভিহিত ছিলেন। তিনি একদিকে ছিলেন অনন্য চিন্তক, দর্শনের অধ্যাপক, সর্বজনীন প্রেম ও প্রজ্ঞার এক বিরল ব্যক্তিত্ব, সর্বোপরি একজন উঁচুস্তরের মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ। তাঁর চিন্তার পরিসর ছিল সর্বব্যাপী, তা ছিল মানবতা ও বিশ্বপ্রেম-রসে জারিত। তার দর্শনচিন্তা তত্ত্বের কঠোর আবরণ থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাবহারিক জীবনে উদ্ভাসিত, প্রেম-রসে নিমজ্জিত যাতে অবগাহন করা যায় স্বচ্ছন্দে, নির্দ্বিধায়। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে আমাদের জ্ঞানের পরিধি আরো সম্প্রসারিত করে বিশ্বপ্রেমে আবৃত করতে হবে, আর তাহলেই সেই জ্ঞান মানুষের হৃদয়তন্ত্রীতে বেজে উঠবে, তার মর্মে ও কর্মে প্রকাশ পাবে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব একজন স্মরণীয় বাঙালি। যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেক ও গভীর দার্শনিক দৃষ্টি দিয়ে জীবন ও জগতকে প্রত্যক্ষণ করেছেন তিনি। তাঁর জীবন, কর্ম ও দর্শন তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।
লেখক বলছি
এদিন ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার ইসহাক খান, প্রাবন্ধিক ও গবেষক মিল্টন বিশ্বাস, শিশুসাহিত্যিক সারওয়ার-উল ইসলাম এবং কবি মেঘ অদিতি।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি বিমল গুহ, শিহাব সরকার এবং টোকন ঠাকুর। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মীর বরকত, কাজী মাহতাব সুমন এবং অনন্যা লাবণী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পুঁথি পাঠ করেন জালাল খান ইউসুফী। এছাড়াও ছিল নূরুননবী শান্তের পরিচালনায় ‘ভাবনগর ফাউন্ডেশন’ পরিবেশিত চর্যাপদের গান এবং মো. সাকিবুল ইসলামের পরিচালনায় নৃত্যসংগঠন ‘মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি একাডেমী’র পরিবেশনা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী সুমন চৌধুরী, শাহনাজ নাসরীন ইলা, ডা. মকবুল হোসেন, অরূপ বিশ্বাস, করবী দাস, স্নিগ্ধা অধিকারী, নূরতাজ পারভীন এবং জান্নাত-এ-ফেরদৌসী।
বৃহস্পতিবার মেলার সময়সূচি
অমর একুশে বইমেলার অষ্টম দিন, বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) মেলা শুরু হবে বিকাল ৩টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ: আহমদ শরীফ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রাজীব সরকার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মোরশেদ শফিউল হাসান এবং আফজালুল বাসার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী।
আরও পড়ুন:









