X
মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪
১০ বৈশাখ ১৪৩১

ডিবির সোর্স জালাল হত্যা মামলা শেষ হবে কবে?

জামাল উদ্দিন
০৫ মার্চ ২০২৪, ২১:০০আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৪, ২১:০০

জালাল আহমেদ (শফি) খুন হন প্রায় ২৫ বছর আগে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কয়েকজন সদস্যের হাতে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়েই খুন হয়েছিলেন তিনি। খুনের পর তার লাশ গুম করা হয়। জালাল ছিলেন ডিবির সোর্স।

১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ের ছাদের পানির ট্যাংক থেকে জালালের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের পর এ নিয়ে তখন ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে ঢাকা মহানগর চতুর্থ অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে এ মামলার আসামিদের পক্ষে সাফাই সাক্ষী চলছে। আগামী ১৩ মার্চ এ মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

মামলার এজাহারে যা বলা হয়

জালাল আহমেদ শফির মরদেহ উদ্ধারের পর রমনা থানার তখনকার এসআই এস এম আলী আজম সিদ্দিকী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ সকাল ৬টার দিকে মিন্টু রোডের ডিসি ডিবি ও ডিসি দক্ষিণের অফিসের ছাদের ওপরে থাকা পানির টাংকের ভেতরে প্যান্ট-শার্ট পরিহিত একজনের মরদেহ রয়েছে বলে সংবাদ পাওয়া যায়। তখন প্রথমে ওইদিনই একটি অপমৃত্যুর মামলা (নং-৩০/৯৯) দায়ের করা হয় রমনা থানায়। এই অপমৃত্যুর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে রমনা থানার এস আই এসএম আলী আজম সিদ্দিকী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

দায়িত্ব পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি দেখেন, ট্যাংকের ওপর ঢাকনা দিয়ে ঢাকা রয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট আবদুস সালাম মিয়াসহ বিকাল চারটার দিকে আবার ঘটনাস্থলে যান আলী আজম । ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহের সুরতহাল তৈরি করে অর্ধ্বগলিত মরদেহটি ট্যাংক থেকে উদ্ধার করেন। মৃত ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ৫৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিচয় পাওয়া না যাওয়ায়, তার মুখমণ্ডলের ছবি ও হাতের আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) ব্যবস্থা নিতে আবেদন করা হয়।

অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য তখন মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরদিন ২৬ মার্চ মরদেহটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে ঘটনার তথ্য বের করতে পুলিশের এই কর্মকর্তা গোপনে ও প্রকাশ্যে তদন্ত করেন। ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিকতায় প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এটি কোনও স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। এক বা একাধিক ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ সকাল ৬টার আগে কোনও এক সময় তাকে ঘটনাস্থলের ভবনের ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে তাকে হত্যা করে মৃতদেহটি পানির ট্যাংকের ভেতরে গোপন করে রাখে।

নিহত জালালের ছেলের এজাহারে যা বলা হয়

লাশ শনাক্ত হওয়ার পর নিহত জালাল আহমেদ শফির ছেলে আব্বাস উদ্দিন বাদী হয়ে ১৯৯৯ সালের ৪ এপ্রিল একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আব্বাস উদ্দিনের এজাহার অনুযায়ী, নিহত জালাল আহমেদ শফি ছিলেন মাইক্রোবাস চালক। প্রথমে নিজের মাইক্রোবাস চালাতেন। পরে নিজের মাইক্রোবাস বিক্রি করে ভাড়ায় চালাতেন। ডিবি পুলিশ কোনও গাড়ি রিকুইজিশন করলে সেই গাড়ি চালানোর জন্য জালালকে ডাকা হতো। এভাবেই ডিবি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল।

এজাহারে আরও বলা হয়, ডিবি ইন্সপেক্টর জিয়াউল আহসান ও এসআই আরজু প্রায়ই তাকে ডেকে নিতেন। ১৯৯৯ সালের ২০ মার্চ মোহাম্মদপুর থানা এলাকার লালমাটিয়ার বাসা থেকে গাড়ির লাইসেন্স ও চেক বই নিয়ে রাত তিনটায় ডিবি অফিসের উদ্দেশে বের হন জালাল। কয়েক দিন বাড়িতে না ফেরায় পরিবারে ধারণা ছিল, তিনি ঢাকার বাইরে গেছেন। ৩১ মার্চ কয়েকজন লোক জালালের বাসায় গিয়ে জালালের ছবি দেখিয়ে পরিচয় জানতে চায়। এরপর পরিবারের লোকজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে গিয়ে জালালের লাশ শনাক্ত করেন।

অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) যা আছে

রমনা থানা পুলিশ তদন্ত শেষে ১৯৯৯ সালের ২৭ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। পুলিশ মামলাটির অভিযোগপত্র দিলেও আদালত অধিকতর তদন্ত করতে পুনরায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। অধিকতর তদন্ত করেন সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তিনি গোয়েন্দা পুলিশের ড্রাইভার মো. আবদুল মালেক, ডিবির পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) মো. জিয়াউল আহসান, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ ও ডিবির ক্যান্টিনের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেন। একইসঙ্গে ড্রাইভার আবদুল মালেক ছাড়া বাকিদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করেন। সেই সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসসহ আলামত হিসেবে বেশ কিছু উপকরণ জব্দ করে আদালতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যসহ ৪৫ জনকে মামলার সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়।

অধিকতর তদন্তের পর দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, পুলিশ পরিদর্শক মো. জিয়াউল আহসান, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুর রউফ ও আনোয়ার হোসেনকে অভিযুক্ত করে রমনা থানা পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছিল। অধিকতর তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে আরও কিছু সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। এর বাইরে ড্রাইভার আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়।

অধিকতর তদন্তে যা জানা যায়

পুলিশ পরিদর্শক মো. জিয়াউল আহসান ১৯৯৯ সালের ১৯ মার্চ রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে তাদের টিমে ব্যবহৃত মাইক্রোবাস দিয়ে ড্রাইভার আবদুল মালেক, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ এবং ডিবি ক্যান্টিনের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেনকে পাঠানো হয় জালাল আহমেদ শফিকে বাসা থেকে ডেকে আনার জন্য। জিয়াউল আহসানের নির্দেশ অনুযায়ী, লালমাটিয়ার বাসা থেকে তারা জালাল আহমেদ ওরফে শফিকে নিয়ে রাত তিনটার দিকে ডিবি অফিসে জিয়াউল আহসানের কক্ষে যায়। সেখানে জালালকে পানি খাওয়ানো হয়। পরে তাকে নিয়ে তারা ডিবি অফিসের ছাদে যায়। ছাদে তাকে মারধর করে হত্যার পর একটি পানির ট্যাংকের মধ্যে জালালের মরদেহ গোপন করে রাখে। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। সম্পূরক অভিযোগপত্রটি ১৯৯৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান।

যে কারণে জালালকে হত্যা করা হয়   

জালাল হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে হত্যার কারণ সম্পর্কে বলা হয়—  জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় অবৈধ স্বর্ণ, হেরোইন ও মাদক চোরাচালানের তথ্য পাওয়ার জন্য জালাল আহমেদ শফিকে ‘সোর্স’ হিসেবে ব্যবহার করতেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ইন্সক্টের জিয়াউল আহসান। এ মামলার আসামিরা জালালের তথ্যের ভিত্তিতে চোরাকারবারিদের আটক করে চোরাচালানের পণ্য নিজেদের দখলে নিতেন। কিন্তু জালালকে তার ভাগ থেকে বঞ্চিত করা হতো।

১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ জালাল বিমানবন্দর এলাকায় একটি সোনা চোরাচালানকারী চক্রের তথ্য ডিবির অন্য একটি দলকে দিয়ে দেন। এতে ক্ষুদ্ধ হন জিয়াউল আহসান। পরে ১৯ মার্চ রাতে অন্য আসামিদের সহযোগিতায় জালালকে বাসা থেকে ডেকে এনে খুন করেন জিয়াউল ও তার সহযোগীরা।

আইনজীবীরা যা বলছেন

২৫ বছর আগের আলোচিত এ মামলার বিচার চলছে ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালতে আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানিও শেষ হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে অনেক আগেই। তদন্ত কর্মকর্তাকেও জেরা করা হয়েছে। এ হত্যা মামলায় অসঙ্গতি রয়েছে অনেক। যে কারণে এ মামলার আসামিরা খালাস পাবে বলে তিনি আশা করছেন।’ আগামী ১৩ মার্চ আসামিদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অপরদিকে, ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মাহফুজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জালাল হত্যা মামলায় আসামিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পেরেছে। বর্তমানে আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষীর জন্য মামলা অপেক্ষমান আছে। কিন্তু সাফাই সাক্ষী আসছে না বলে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে।’ তবে খুব শিগগির এ মামলার বিচার নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
অভিনেতা জোভান-মাহিসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন
প্রতিদিন খোয়া যাচ্ছে সহস্রাধিক মোবাইল, উদ্ধারে আগ্রহ কম পুলিশের
চিকিৎসা করাতে ‍এনে কিশোরীকে ধর্ষণ, আসামির যাবজ্জীবন
সর্বশেষ খবর
তাইওয়ানে আবারও ভূমিকম্প
তাইওয়ানে আবারও ভূমিকম্প
পাঁচ ম্যাচ বাকি থাকতেই শিরোপা জিতলো ইন্টার মিলান 
পাঁচ ম্যাচ বাকি থাকতেই শিরোপা জিতলো ইন্টার মিলান 
টিভিতে আজকের খেলা (২৩ এপ্রিল, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (২৩ এপ্রিল, ২০২৪)
গরমে বাড়ছে চর্ম রোগ, প্রতিরোধের উপায় কী?
গরমে বাড়ছে চর্ম রোগ, প্রতিরোধের উপায় কী?
সর্বাধিক পঠিত
সিলিং ফ্যান ও এসি কি একসঙ্গে চালানো যাবে?
সিলিং ফ্যান ও এসি কি একসঙ্গে চালানো যাবে?
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস এবং কোথায় কেমন গরম পড়বে
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস এবং কোথায় কেমন গরম পড়বে
টাকা উড়ছে রেস্তোরাঁয়, নজর নেই এনবিআরের
টাকা উড়ছে রেস্তোরাঁয়, নজর নেই এনবিআরের
সাবেক আইজিপি বেনজীরের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করবে দুদক
সাবেক আইজিপি বেনজীরের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করবে দুদক
রাজকুমার: নাম নিয়ে নায়িকার ক্ষোভ!
রাজকুমার: নাম নিয়ে নায়িকার ক্ষোভ!