কোটা নিয়ে আপিল শুনানিতে সেদিন যা হলো

বাহাউদ্দিন ইমরান
২৪ জুলাই ২০২৪, ২১:২৫আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৪, ২১:২৫

সরকারি চাকরিতে কোটা বহাল রাখা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল গত ২১ জুলাই। সেদিন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুই শিক্ষার্থীর করা আপিল আবেদনের ওপর দীর্ঘ শুনানি হয়। একই শুনানিতে বক্তব্য রাখেন মোট ১১ জন আইনজীবী। আইনজীবীদের বক্তব্যে উঠে আসে কোটা নিয়ে নানান প্রসঙ্গ।

সেদিন (২১ জুলাই) সকাল ১০টা ১৭ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি চলে।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। এছাড়া কোটা এবং কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায়, আদালতের এখতিয়ার নিয়ে মতামত তুলে ধরেন— জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ, জেড আই খান পান্না, জয়নুল আবেদীন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার আহসানুল করিম, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও আইনজীবী তানজীব-উল আলম।

দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টা শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন আদালতকে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৫ আগস্ট প্রথম কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করে সরকার। ২০১৩ সালে আপিল বিভাগ যখন ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত দেয়— তখনও কোটা পদ্ধতি ছিল। ২০১৮ সালে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কোটা পদ্ধতিটিই বাতিল করে দেয়। অর্থাৎ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে কোটা থাকবে না। হাইকোর্ট এখন যখন কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে রায় দিলেন, তখন তো কোটা পদ্ধতিই নাই এবং আপিল বিভাগের সর্বশেষ (২০২২ সালের রায় অনুসারে) সিদ্ধান্ত অনুসারে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এমনকি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত কোনও পরামর্শও দিতে পারে না, যদি না সে সিদ্ধান্ত নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে, সংবিধানকে লঙ্ঘন করে। ফলে হাইকোর্টের রায়টি (গত ৫ মে কোটা পুনর্বহালের রায়) বাতিল করা হোক।

পরে আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে সমর্থন জানিয়ে বলেন, হাইকোর্ট রায়ে বলার চেষ্টা করেছেন যে, মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্রের অনগ্রসর অংশ। অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা বরাদ্দ করা হয়েছে বিশেষ মর্যাদায়, অনগ্রসর হিসেবে নয়। মুক্তিযোদ্ধারা কখনোই অনগ্রসর হতে পারেন না। তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং সবচেয়ে অগ্রগামী অংশ। তাছাড়া সংবিধানের কোথাও মুক্তিযোদ্ধাদের অনগ্রসর হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। বরং বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ফলে আমি কোটা বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল চাচ্ছি। পাশাপাশি কোটার যৌক্তিক সংস্কার চাচ্ছি। সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে ন্যায়বিচারের স্বার্থে সর্বোচ্চ আদালত সে আদেশ দিতে পারেন।

কোটা পুনর্বহাল চাওয়া রিটকারীদের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী শুনানিতে বলেন, ১৯৭৫ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা সুবিধা দেওয়া হলেও পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২১ বছর এই কোটার কোনও বাস্তবায়ন ছিল না। বরং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয় ছিল অযোগ্যতা। মুক্তিযোদ্ধার একজন সন্তানও এই সময়ে চাকরি পায়নি। মুক্তিযুদ্ধ করেছে এদেশের কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষ। তারা জীবন দিয়ে রক্ত দিয়ে এ দেশের স্বাধীনতা এনেছেন। মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতি তাদের হয়েছে। তারা কেউ আদরের দুলাল ছিলেন না। সংবিধানে না থাকলেও সে বিবেচনায় তারা জাতির অনগ্রসর অংশ। যাই হোক, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করে। মানছি, কোটা পদ্ধতি রাখা না রাখা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু ২০১৮ সালে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে কোটা বাতিল করে আর সব শ্রেণির চাকরিতে কোটা বহাল রাখলো। এটা হতে পারে না। সরকারের এরকম নীতিগত সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক? ২০১৮ সালে কোটা বাতিলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কারণ তো থাকা দরকার ছিল।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ শুনানিতে বলেন, কোটা পদ্ধতি নিয়ে হাইকোর্ট তার রায়ে সরকারের নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন। কিন্তু এই হস্তক্ষেপের বিষয়ে রায়ে কোনও যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে রায়টি বাতিল করা হোক।

আইনজীবী আহসানুল করিম তার মতামত তুলে ধরে শুনানিতে বলেন, আমাদের সংবিধান যারা প্রণয়ন করেছেন, তারা কখনোই মুক্তিযোদ্ধাদের অনগ্রসর অংশ হিসেবে বিবেচনা করেননি। সেজন্য তাদের অনগ্রসর অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কোটা ও মেধার মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে মেধাই প্রাধান্য পাবে। আর কোটা বাতিল সংস্কারেরই অংশ। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারতেও মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল। কিন্তু সেখানে তাদের অনগ্রসর হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। বরং সবচেয়ে অগ্রগামী হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তাছাড়া কোনও নাগরিক নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে কোনো কিছু নির্ধারণ করে দিতে পারে না।

মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনির কোটা সুবিধা দেওয়া নিয়ে আইনজীবী তানিয়া আমীর শুনানিতে বলেন, যাদের জন্মই হয়নি তারা কীভাবে অনগ্রসর হয়? তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কখনোই অনগ্রসর হতে পারেন না। যদি তা না হয় তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান বা নাতি-নাতনি কীভাবে অনগ্রসর হন? মুক্তিযোদ্ধারা যদি অনগ্রসর না হন, তাহলে হাইকোর্ট যে রিট আবেদনের ওপর রায় দিয়েছেন, সে রিটটিই মেইনেটনেবল (গ্রহণযোগ্য) না। কারণ যিনি বা যারা রিট করেছেন, তাদের তারা কেউই অনগ্রসর অংশ নন এবং তাদের রিট করারই এখতিয়ার নেই। ফলে রায়টি (হাইকোর্টের) বাতিল করা হোক।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন শুনানিতে বলেন, কোটা সরকারের নীতি-নির্ধারণী বিষয় হলেও সামাজিক-অর্থনৈতিক বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। বৈষম্য না রাখার কথা সংবিধানে উল্লেখ করা হয়েছে। কোটা থাকতে পারে, তবে সংস্কারের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকতে হবে। ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। কোটার মতো নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বর করা উচিত। 

আপিলের অনুমতি না দিয়ে (লিভ টু আপিল গ্রহণ না করে) হাইকোর্টের রায়ের ওপর চূড়ান্ত শুনানি করা যায় কিনা, সে প্রশ্নে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তানজীব-উল আলম শুনানিতে বলেন, আপিল বিভাগে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে শুনানি করতে হলে আগে আপিলের অনুমতি পেতে হয়। অনুমতি পাবে কী পাবে না— এই প্রশ্নে আপিল বিভাগে কোনও শুনানিই হয়নি। যেহেতু বিষয়টি জরুরি তাই হাইকোর্টের রায় নিয়ে সরাসরি শুনানি হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে লিভ টু আপিল গ্রহণ না করেই সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায়ের ওপর সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আমি মনে করি, লিভ টু আপিল গ্রহণ না করেই হাইকোর্টের রায় নিয়ে আপিল বিভাগে শুনানি হতে পারে। এমনকি হাইকোর্টের রায় বাতিলও করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কোটা নিয়ে হাইকোর্ট যে বিষয়ে রুল জারি করেছিল, তার বাইরে গিয়ে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আর নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে সরকারকে কোনও পরামর্শ দিতে পারে না হাইকোর্ট। সুতরাং রায়টি বাতিল করা উচিত।

শুনানিতে জ্যেষ্ঠ জয়নুল আবেদীন ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে একমত পোষণ করে মতামত দেন।

আইনজীবীদের দীর্ঘ শুনানি শেষে বিরতীর পর দুপুর ১টা ২৯ মিনিটে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাসে ফিরে রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটার পরিবর্তে মাত্র ৭ শতাংশ নির্ধারণ করে দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ। মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ; ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করে এ রায় দেওয়া হয়। তবে সরকার প্রয়োজন ও সার্বিক বিবেচনায় আদালত নির্ধারিত কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে বলেও রায়ে উল্লেখ করেন আপিল বিভাগ।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সুপ্রিম কোর্টের একটি ভবন থেকে হাইকোর্ট-কর্মচারীর মরদেহ উদ্ধার
কেমন চলছে ‘সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন নম্বর’ 
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি কি আদালত অবমাননার শামিল 
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম